একসময় দেশের অন্যতম বৃহৎ চিনিকল হিসেবে পরিচিত ছিল জয়পুরহাট সুগার মিল। অথচ বছরের পর বছর অব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় আধুনিকায়নের অভাব ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতিতে বর্তমানে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পপ্রতিষ্ঠান। অযত্নে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ, অন্যদিকে বাড়ছে লোকসানের পাশাপাশি ঋণের বোঝা। মিলটি বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের উদ্যোগের প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। তাদের দাবি, সঠিক ব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে জয়পুরহাট সুগার মিলকে আবারও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা সম্ভব।
জানা যায়, ১৯৬২ সালে প্রায় ১০০ একর জায়গার ওপর জয়পুরহাট সুগার মিল নির্মাণ করা হয়। ১৯৬৩ সালে বড় পরিসরে উৎপাদনে যায় প্রতিষ্ঠানটি। একসময় উৎপাদন সক্ষমতার দিক থেকে এটি ছিল দেশের অন্যতম বৃহৎ চিনিকল। মিলকে ঘিরে উত্তরাঞ্চলে ব্যাপক কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠে।
তবে সময়ের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন, যন্ত্রপাতি সংস্কার এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন সক্ষমতা কমতে থাকে। কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে লোকসানও বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোটি কোটি টাকার ঋণের বোঝা।
অন্যদিকে চিনিকল প্রাঙ্গণে অযত্নে পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে ট্রাক, ট্রাক্টর, ক্রেন, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ। বছরের পর বছর ব্যবহার না হওয়ায় অনেক যানবাহন ও যন্ত্রাংশ অকেজো হয়ে পড়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে একাধিকবার শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এরই মধ্যে মিলটি বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের উদ্যোগের প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা।
জয়পুরহাট চিনিকল শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আলী আকতার বলেন, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে শ্রমিক-কর্মচারীদের মতামত নেওয়া হয় না। দীর্ঘদিনের গাফিলতি, সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনার কারণেই মিলটির বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রেখে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনা, সম্পদের সঠিক ব্যবহার ও প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা হলে প্রতিষ্ঠানটি আবারও লাভজনক হতে পারে।
জয়পুরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক ও ডেভেলপমেন্ট ফোরামের সদস্যসচিব ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল বাতেন বলেন, শুধু আর্থিক সংকট নয়, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবও মিলটির বর্তমান অবস্থার জন্য দায়ী। আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন, সম্পদের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন নিশ্চিত করা গেলে প্রতিষ্ঠানটি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
জয়পুরহাট চিনিকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ খবির উদ্দিন মোল্লা বলেন, উৎপাদন বৃদ্ধি, আখ চাষ সম্প্রসারণ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংস্কার এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে মিলটি আবারও ঘুরে দাঁড়াবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলেন, একসময় উত্তরাঞ্চলের শিল্প ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল জয়পুরহাট সুগার মিল। প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন অব্যবস্থাপনার অবসান, সম্পদের সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবসম্মত সংস্কার পরিকল্পনা। তা না হলে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদের পাশাপাশি হারিয়ে যেতে পারে উত্তরাঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পপ্রতিষ্ঠান।
এসএ




Comments