Image description

ফেনীতে আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়লেই আতঙ্কিত মানুষ যখন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটেন, তখন বিপরীত দিকে ছুটে যান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। আগুনের শিখা, ঘন কালো ধোঁয়া, বিস্ফোরণ কিংবা ভবন ধসে পড়ার আশঙ্কা—কোনোটিই তাদের থামাতে পারে না। একটি জীবন বাঁচানোর প্রত্যয়ে নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে রেখেই ঘটনাস্থলে পৌঁছান তারা।

ফেনী শহরের ব্যস্ত মার্কেট, আবাসিক ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা মহাসড়কের দুর্ঘটনাস্থল—জরুরি খবর পেলেই ছুটে যেতে হয় ফায়ারফাইটারদের। কখনো জ্বলন্ত ভবনে প্রবেশ করে মানুষকে বের করে আনতে হয়, কখনো দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িতে আটকে পড়া ব্যক্তিকে উদ্ধার করতে হয়। আবার পানিতে নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানেও নামতে হয় তাদের। পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও লক্ষ্য একটাই—মানুষের জীবন রক্ষা।

ফেনী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ হারুন পাশা বলেন, মানুষের জীবন রক্ষাই ফায়ার সার্ভিসের প্রধান দায়িত্ব। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি বুঝে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আগুনের মাত্রা, ভবনের অবস্থা ও মানুষের অবস্থান বিবেচনা করে উদ্ধার ও অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম পরিচালনা করেন কর্মীরা।

তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর রাখা গেলে দুর্ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

ফেনী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের সিনিয়র স্টেশন অফিসার মো. শাহাদাৎ হোসেন স্টেশনের কার্যপ্রণালি সম্পর্কে বলেন, আগুনের ঘটনায় দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোই প্রথম চ্যালেঞ্জ। এরপর আগুনের উৎস ও বিস্তারের দিক বিবেচনা করে অভিযান পরিচালনা করতে হয়। অনেক সময় ধোঁয়া ও অতিরিক্ত তাপের কারণে ভেতরে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোথাও মানুষ আটকে থাকার তথ্য থাকলে সেই ঝুঁকি নিয়েই উদ্ধার অভিযান চালাতে হয়।

তিনি বলেন, আধুনিক সরঞ্জামের পাশাপাশি প্রশিক্ষিত জনবল উদ্ধারকাজের জন্য অপরিহার্য। দুর্ঘটনাস্থলে সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। অযথা ভিড় না করে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও কর্মীদের চলাচলের পথ খোলা রাখলে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের দায়িত্বের বড় অংশই ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে স্টেশন অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. নুরুল আলম বলেন, মানুষের জীবন বাঁচানোই তাদের প্রথম অগ্রাধিকার। আগুন লাগলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হবে এবং ফায়ার সার্ভিসকে সঠিক তথ্য দিতে হবে।

ফেনীতে নগরায়ণ ও বাণিজ্যিক স্থাপনা বাড়ার সঙ্গে অগ্নিঝুঁকিও বাড়ছে। মার্কেট, বিপণিবিতান, গুদাম, কারখানা ও আবাসিক ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন। জরুরি বহির্গমন পথ, অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, বৈদ্যুতিক সংযোগ এবং নিরাপত্তা মহড়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

ফায়ারফাইটারদের ঝুঁকি শুধু আগুনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সড়ক দুর্ঘটনায় উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে ভাঙা গাড়ি, বৈদ্যুতিক তার কিংবা বিস্ফোরণের আশঙ্কা মোকাবিলা করতে হয়। পানিতে উদ্ধার অভিযানেও থাকে নানা ধরনের ঝুঁকি। তবুও বিপদের খবর পেলেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন তারা।

দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহু ফায়ারফাইটার আহত ও নিহত হয়েছেন। ২০২২ সালে সীতাকুণ্ডের বিএম কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিনির্বাপণের সময় ফায়ার সার্ভিসের ১৩ কর্মীর মৃত্যু দায়িত্ব পালনের ঝুঁকির একটি বড় উদাহরণ। এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয়, মানুষের জীবন রক্ষার এই পেশায় প্রতিটি অভিযানেই থাকে অনিশ্চয়তা।

ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়াতে আধুনিক সরঞ্জাম, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে কর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত জনবল এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।

আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ফায়ারফাইটার জানেন না পরের মুহূর্তে কী ঘটবে। তারপরও মানুষের কান্না ও বিপদের খবর তাকে পিছু হটতে দেয় না। অন্যের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে রেখে এগিয়ে যাওয়াই তাদের দায়িত্ব। ফেনীর ফায়ারফাইটারদের প্রতিদিনের এই নীরব লড়াই তাই মানুষের নিরাপত্তার আড়ালে থাকা এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

এসএ