Image description

যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী ও বড় অস্ত্র নির্মাতাদের একপ্রকার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে সিলিকন ভ্যালির শীর্ষ ধনকুবেরদের অর্থায়নে নির্মিত প্রতিরক্ষা স্টার্টআপ 'কভেন্যান্ট' উন্মোচন করেছে তাদের নতুন তৈরি শক্তিশালী ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। অত্যন্ত দ্রুত সময়ে ব্যাপক পরিমাণে এবং তুলনামূলক কম খরচে এটি তৈরি করা সম্ভব বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘ দুই বছরের নিবিড় গবেষণা ও উন্নয়নের পর বুধবার 'অ্যানথেম' নামের এই ভারী পে-লোডের দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় কোম্পানিটি।

ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর মধ্যে তৈরি হওয়া ক্ষেপণাস্ত্র সংকট কাটাতে এবং নিজেদের অস্ত্রাগার স্বল্পমূল্যের নিখুঁত লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্রে পুনর্গঠন করতে যখন আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র তোড়জোড় চলছে, ঠিক সেই মুহূর্তেই কভেন্যান্টের পক্ষ থেকে এই চমকপ্রদ খবরটি সামনে এলো।

ভূমি থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য এই 'অ্যানথেম' ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রটি ২০০ কেজিরও বেশি ওজনের বিস্ফোরক পে-লোড বহনে সক্ষম। এটি মূলত অন্যান্য দীর্ঘপাল্লার দূরপাল্লার টমাহক এবং লকহিড মার্টিনের তৈরি জয়েন্ট এয়ার-টু-সারফেস স্ট্যান্ডঅফ মিসাইল-এক্সটেন্ডেড রেঞ্জের মতো শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাশাপাশি একটি বড় বহর বা উচ্চ সংখ্যায় ব্যবহার করার উদ্দেশ্যে ডিজাইন করা হয়েছে। বর্তমানে মূলধারার বড় বড় প্রতিরক্ষা ঠিকাদারদের তৈরি এই ধরনের সমমানের অস্ত্রগুলোর দাম যেমন অত্যন্ত চড়া, তেমনই সেগুলোর উৎপাদন ক্ষমতাও বেশ সীমিত। সিলিকন ভ্যালি সমর্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিনের সেই প্রচলিত ধারণাকে বদলে দেওয়ার লক্ষ্যেই মূলত নিজেদের কার্যক্রম শুরু করেছে।

২০২৪ সালে যাত্রা শুরু করা কভেন্যান্ট নামক এই স্টার্টআপটি ইতিমধ্যে অ্যান্ড্রেসেন হোরোউইটজ, ফাউন্ডার্স ফান্ড, লাক্স এবং লাইটস্পিডের মতো প্রভাবশালী বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি তহবিল সংগ্রহ করেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি এবং ইসরায়েল জুড়ে তাদের ২০০ জনেরও বেশি কর্মী কর্মরত রয়েছে। গত এক বছরে ক্ষেপণাস্ত্রটির কার্যকারিতা ও সক্ষমতা যাচাইয়ে ২০০টিরও বেশি সফল টেস্ট ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়েছে। 'অ্যানথেম' ক্ষেপণাস্ত্রটিতে টেকঅফের জন্য সলিড রকেট মোটর এবং ওড়ার সময় ক্রুজ ফ্লাইটের জন্য হেভি-ফুয়েল জেট ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রটির নকশা ও তৈরির পেছনে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনা শক্তির উত্থান ঠেকানো এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় কৌশলগত অবস্থান দৃঢ় করা। ফিলিপাইনের মতো চীনের কাছাকাছি মার্কিন মিত্র দ্বীপগুলো থেকে ভূমিভিত্তিক অস্ত্র ব্যবহার করে প্রায় ২ হাজার মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতেও সহজে আঘাত হানার একটি নতুন সামরিক পরিকল্পনা আঁকা হচ্ছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে এই অ্যানথেম।

বাণিজ্যিক উৎপাদন পুরোপুরি শুরু হলে প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের দাম আনুমানিক পাঁচ থেকে ছয় লাখ ডলারের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কোম্পানিটি প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের প্রাথমিক অর্ডার পেয়ে গেছে এবং আশা করা হচ্ছে ২০২৭ সাল থেকে পণ্য সরবরাহ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর পাশাপাশি তাদের রাজস্ব আয় নিশ্চিত হবে। নতুন কোনো প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সরবরাহ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বা বিশাল সংখ্যায় উৎপাদনের সময় যেসব সরবরাহ-সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দেয়, তা এড়াতে কভেন্যান্ট কোনো একক সরবরাহকারীর ওপর নির্ভর না করে একাধিক রকেট মোটর সরবরাহকারী চুক্তি সম্পন্ন করেছে এবং আগামী দুই বছরের জন্য ৪ হাজারটিরও বেশি জেট ইঞ্জিনের দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি নিশ্চিত করেছে।

উৎপাদন ত্বরান্বিত করতে প্রতিষ্ঠানটি টেক্সাসের ডালাসে তাদের নতুন একটি কারখানা চালু করেছে। এখান থেকে বছরে প্রায় ৫ হাজারটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন করা সম্ভব হবে। এর পাশাপাশি জার্মানির স্যাক্সনিতে একই ক্ষমতাসম্পন্ন আরেকটি বিশাল কারখানা এবং উত্তর ইসরায়েলে বার্ষিক দুই হাজর ইউনিট উৎপাদনের একটি কারখানা পরিচালনা করছে কভেন্যান্ট।
এমআর