Image description

মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের প্রভাব ক্রমেই বাড়াচ্ছে চীন। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান ও জর্ডানের মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সাম্প্রতিক বেইজিং সফর চীনের বাড়তে থাকা কূটনৈতিক প্রভাবকে আরও স্পষ্ট করেছে।

সম্প্রতি কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান বিন জাসিম আল থানির চীন সফর এবং বছরের শুরুতে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেইজিং সফর উপসাগরীয় অঞ্চলে চীনের সক্রিয়তা আরও সামনে এনেছে।

ঐতিহ্যগতভাবে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, অস্ত্র, নৌ সক্ষমতা ও সামরিক ঘাঁটির কারণে অঞ্চলটির প্রধান সামরিক অংশীদার এখনো ওয়াশিংটন। তবে অর্থনীতি ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে চীন দ্রুত নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।

সামরিক শক্তিতে নয়, অর্থনীতিতে চীনের কৌশল

উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করার বিষয়ে চীনের আগ্রহ খুব বেশি নয়। বরং বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলছে বেইজিং।

কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এশিয়ার বাজারে জ্বালানি পরিবহনের সমুদ্রপথ নিরাপদ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে চীনা কোম্পানিগুলোও উপসাগরীয় দেশগুলোতে ব্যবসা, বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ ও জ্বানি কেনার সুযোগ পেয়েছে।

চীনের জন্য তাই যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি নিরাপত্তাব্যবস্থার জায়গা দখল করে পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার চেয়ে বিদ্যমান ব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানো বেশি লাভজনক।

বন্দর থেকে প্রযুক্তিবাড়ছে চীনা বিনিয়োগ

উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতেও চীনা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর অংশীদারত্ব বাড়ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের খলিফা বন্দরের সিএসপি আবুধাবি টার্মিনালের যৌথ উদ্যোগে চীনের কসকো শিপিং পোর্টসের নিয়ন্ত্রণমূলক অংশীদারত্ব রয়েছে।

এর পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, উৎপাদনশিল্প, পণ্য পরিবহন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও চীনা কোম্পানিগুলোর উপস্থিতি বাড়ছে।

এসব বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় বন্দর, কারখানা, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক সহজে বিচ্ছিন্ন করা কঠিন। এভাবেই সামরিক উপস্থিতির বাইরে একটি স্থায়ী প্রভাববলয় তৈরি করছে চীন।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনদুই পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখতে চায় উপসাগরীয় দেশগুলো

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখছে না। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা ও পশ্চিমা প্রযুক্তি চায়, অন্যদিকে চীনের বিশাল বাজার, উৎপাদন সক্ষমতা, বিনিয়োগ ও এশীয় অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের সুবিধাও নিতে চায়।

তাদের লক্ষ্য কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য ও কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়ানো।

ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের পর এই কৌশলের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে একটি নিরাপত্তা অংশীদার, একটি বাজার বা একটি নৌপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি স্পষ্ট হয়েছে।

তেলের বাইরে নতুন অর্থনীতি

উপসাগরীয় দেশগুলো তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত উৎপাদনশিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার মতো নতুন খাত গড়ে তুলছে।

সৌদি আরবের হিউমেইন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের জি৪২ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখিয়েছে। তবে এই শিল্প গড়ে তুলতে উন্নত চিপ, ডেটা সেন্টার, বিপুল বিদ্যুৎ, কম্পিউটিং অবকাঠামো, বিনিয়োগ ও দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন।

এ কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো এমন অংশীদার খুঁজছে, যারা তাদের নতুন অর্থনীতি গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় অর্থ, প্রযুক্তি ও শিল্প সহযোগিতা দিতে পারে। এই জায়গাতেই চীনের বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ

চীনের এই কৌশল দেখিয়ে দিচ্ছে, কোনো অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের একমাত্র মাপকাঠি সামরিক শক্তি নয়। উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্র এখনো প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সহযোগিতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি কোম্পানি ও কূটনৈতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে গভীরভাবে যুক্ত।

অন্যদিকে চীন বাণিজ্য, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থ তৈরি করছে। ভবিষ্যতে এসব অর্থনৈতিক সম্পর্ক রাজনৈতিক প্রভাবেও রূপ নিতে পারে।

তাই উপসাগরীয় দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের যেকোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে বাধ্য করার বদলে ওয়াশিংটনের উচিত আরও শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বিকল্প তৈরি করা।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে চীনের লক্ষ্য সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে তার জায়গা নেওয়া নয়। বরং সামরিক অতিরিক্ত বিস্তার এড়িয়ে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এমন প্রভাব তৈরি করা, যা দীর্ঘমেয়াদে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকবে।

সূত্র: আল-জাজিরা

এনএ