ভারতের চলমান যুব ও ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত মুখ হয়ে উঠেছেন নেহা বোরা। বামপন্থী ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আলোচনায় এসেছেন।
গত সোমবার (৫ অক্টোবর) যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তব্যে নেহা বলেন, ‘দিল্লিতে রক্তক্ষরণ হলে কলকাতা উঠে দাঁড়ায়, কলকাতার রক্ত বইলেও দিল্লি পাশে থাকবে।’ তখন তার গলা ভাঙা এবং কথা বলতে অস্বস্তি হচ্ছিল।
এর ঠিক এক দিন আগে দিল্লিতে পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন নেহা। যন্তর মন্তর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে নারেলা এলাকায় নিয়ে যাওয়ার পর সন্ধ্যায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এর আগের দুই দিন দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন তিনি। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতেও জড়ান।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় নেহা বলেন, ‘আমার গলা ও শরীরের যা অবস্থা যেমন ভাঙা, তেমনই অবস্থা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও এসআরএফটিআইয়ের।’
আন্দোলনেই পরিচিতি
নেহার সক্রিয় আন্দোলন-যাত্রা শুরু হয় ২০২৬ সালের জুলাইয়ে। ভারতের মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস মামলায় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের সময় তিনি আলোচনায় আসেন।
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) এই আন্দোলনের সমর্থনে কয়েকজন সহকর্মীর সঙ্গে অনশনে অংশ নেন নেহা। এরপর ঝাড়খণ্ড পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় কথিত অনিয়মের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে রাঁচিতে যান তিনি।
সেই আন্দোলনের সময় তার মুখে কালি ছোড়া হয়। তবে এতে ভয় পাওয়ার প্রশ্ন নেই জানিয়ে নেহা বলেন, ‘মুখে কালি ছুড়ে মারলে আমি ভয় পাওয়ার মানুষ নই। দিল্লির আন্দোলনের সময়ে আমি প্যালেট গান এবং লাঠিচার্জেরও মুখোমুখি হয়েছি।’
এরপর বিহারে গিয়ে সিজেপির বিক্ষোভের সময় গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিতেও আন্দোলন করেন তিনি। কয়েক বছর ধরে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় নেহা এখন ভারতের বিভিন্ন যুব ও ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত মুখ।
দিল্লিতে নতুন আন্দোলন
বর্তমানে নেহা আবার দিল্লিতে আন্দোলনে নেমেছেন। এবার তার নেতৃত্বে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন চলছে।
একাধিক বিরোধী দলের অভিযোগ, দেশে চলমান এসআইআর প্রক্রিয়ায় কথিত অনিয়মের জন্য জ্ঞানেশ কুমার দায়ী এবং এর ফলে কোটি কোটি মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ হারিয়েছেন।
সম্প্রতি ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, এসআইআর প্রক্রিয়াকে ঘিরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও দুই নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্দোলনের ময়দানে
নেহা উত্তরাখণ্ডের বাসিন্দা। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং আম্বেদকর ইউনিভার্সিটি, দিল্লি থেকে এমএ সম্পন্ন করেছেন তিনি। বর্তমানে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) পিএইচডি করছেন।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও জেএনইউতে বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের পরিচিত মুখ নেহা। ক্যাম্পাস রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন গণআন্দোলনেও তাকে নিয়মিত দেখা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বক্তৃতার একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। দৃঢ় অবস্থান, স্পষ্টভাষী বক্তব্য ও লড়াকু মনোভাবের কারণে তিনি সংবাদমাধ্যমেও আলোচিত হচ্ছেন।
পথে নেমেই পথ চিনেছেন
সম্প্রতি ‘ফ্রন্টলাইন’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেহা যন্তর মন্তরের আন্দোলনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আন্দোলনে গডসে ও ভগৎ সিংয়ের রাজনৈতিক অবস্থানের তুলনা টানা হয়েছে এবং বিভাজনের রাজনীতির বিরোধিতা করা হয়েছে।
নেহার মতে, এসব আন্দোলন দেখিয়েছে যে তরুণ প্রজন্ম বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে কী চায় না। তার ভাষায়, একে অপরের বিরুদ্ধে না গিয়ে একে অপরের জন্য লড়াই করার মানসিকতা তরুণদের মধ্যে তৈরি হওয়া প্রয়োজন।
তিনি মনে করেন, আন্দোলনের শক্তি ও উদ্দীপনা এসআইআর, নির্বাচনক্ষেত্র পুনর্নির্ধারণ, শ্রমিকদের অধিকার এবং নারীদের সংরক্ষণের মতো অন্যান্য বিষয়েও ছড়িয়ে দেওয়া দরকার।
বিজেপি-সমর্থক পরিবারে বামপন্থী নেহা
নেহা এমন একটি পরিবারে বড় হয়েছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি-সমর্থক। নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে পরিবারের মতপার্থক্যের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
এক সাক্ষাৎকারে নেহা বলেন, ‘আমার নিজের পরিবারেই বিজেপির কট্টর সমর্থক রয়েছেন এবং আমাদের বাড়িতে এ নিয়ে বড় ধরনের মতপার্থক্য ছিল। আমি যখন থেকে দিল্লিতে এসেছি এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়েছি, তখন থেকেই বাড়িতে এই মতপার্থক্য চলছে।’
তিনি জানান, অনেক সময় পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হলেও আর্থিক বিষয় ও নিজের জীবনসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি যথেষ্ট স্বাধীন ছিলেন।
নেহার ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় তার বিজেপি-সমর্থক মা পুলিশি পদক্ষেপ নিজের চোখে দেখার পর আন্দোলনকারীদের প্রচেষ্টার প্রশংসাও করেছিলেন।
‘একে অপরের জন্য লড়লে পরিবর্তন আনা সম্ভব’
নেহার কাছে সিজেপির নিট আন্দোলনের গুরুত্ব শুধু ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি মনে করেন, এই আন্দোলন তরুণ প্রজন্মকে একে অপরের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে একে অপরের জন্য লড়াই করার শিক্ষা দিয়েছে।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যন্তর মন্তরের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এটিকে কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা খোপে ফেলা যায়নি। তার মতে, বিভিন্ন শ্রেণি ও বয়সের মানুষের অংশগ্রহণ আন্দোলনটিকে বৃহত্তর সামাজিক রূপ দিয়েছে।
তিনি জানান, আন্দোলনের সময় বিজেপি-সমর্থক বাবা-মা ও বয়স্ক ব্যক্তিরাও তার কাছে এসেছিলেন। কেউ কেউ আবেগাপ্লুত হয়ে শিক্ষার্থীদের পরিস্থিতির জন্য দুঃখপ্রকাশ করেন।
অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে তুলনা, নেহার জবাব ‘তুলনা নয়, সংহতি’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে নেহা বোরার তুলনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এক ব্যবহারকারী নেহার প্রশংসা করে তাকে অভিজিৎ দীপকের চেয়ে বেশি প্রতিভাবান এবং জেন-জি প্রজন্মের আইকন হিসেবে উল্লেখ করেন।
পোস্টটি পুনরায় শেয়ার করে অভিজিৎ দীপক লেখেন, ‘আমি এর সাথে একমত।’
এরপর নেহা এক্সে লেখেন, ‘তুলনা নয়, সংহতি। আমরা একসাথে লড়ি।’
জবাবে অভিজিৎ লেখেন, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ।’
সিজেপির আন্দোলনের সময় যন্তর মন্তরে এক বিক্ষোভে বক্তব্য দিতে গিয়ে নেহা নিজেও অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, দীপক বিনয়ী এবং অন্যদের পরামর্শ গ্রহণে প্রস্তুত থাকেন। আন্দোলনকারীদের তিনি বোঝাতে পেরেছেন যে তিনিও তাদের মতোই এই সংগ্রামের একজন ছাত্র ও সহযোদ্ধা।
ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণআন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ, স্পষ্ট বক্তব্য এবং দৃঢ় অবস্থানের কারণে নেহা বোরা এখন ভারতের তরুণ ও ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত মুখ হয়ে উঠেছেন।
সূত্র: বিবিসি
এনএ




Comments