বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ৯ প্রকৌশলীকে দুদকের তলব
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে টেন্ডার বাণিজ্য, অনিয়ম ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের অনুসন্ধানে সংস্থাটির নয় নির্বাহী প্রকৌশলীকে তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সাবেক খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী এবং টাঙ্গাইল-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক ও তাঁর আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তাদের বক্তব্য নেওয়া হবে।
দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় শুধু প্রকল্পের অনিয়ম ও ঠিকাদারি বাণিজ্য নয়; এসিআই কোম্পানি ও ব্যবসায়ী নুর আলীর মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে। ফলে বিএমডিএর প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, ঠিকাদারি কাজ বণ্টন, প্রকল্পের অর্থের গতিপথ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে কমিশন।
গত ৩ আগস্ট বিএমডিএর নির্বাহী পরিচালকের কাছে পাঠানো দুদকের চিঠিতে নয় নির্বাহী প্রকৌশলীকে ‘অভিযোগ সংশ্লিষ্ট’ ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুসন্ধানের স্বার্থে তাদের নির্ধারিত তারিখে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
দুদকের চিঠি অনুযায়ী, আগামী ১২ আগস্ট চারজন এবং ১৩ আগস্ট পাঁচজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
১২ আগস্ট তলব করা হয়েছে নাজমুল হুদা, এনামুল কাদির, তোফাজ্জল আলী সরকার ও এটিএম রফিকুল ইসলামকে। আর ১৩ আগস্ট উপস্থিত হতে বলা হয়েছে রেজাউল ইসলাম, রেজাউল করিম, মনিরুজ্জামান, রুবিনা খাতুন ও সানজিদা খানম মলিকে।
দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আব্দুল মালেক তাদের তলব করেছেন।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ড. আব্দুর রাজ্জাক ও তাঁর আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে বিএমডিএর বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, টেন্ডার বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে কমিশন অনুসন্ধান করছে।
একই সঙ্গে এসিআই কোম্পানি এবং ব্যবসায়ী নুর আলীর মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিএমডিএর প্রকল্পে কথিত অনিয়মের পাশাপাশি প্রকল্পের অর্থের গতিপথ, ঠিকাদারি কাজের সুবিধাভোগী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক যোগাযোগের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিএমডিএর একাধিক সূত্রের দাবি, তলব করা কর্মকর্তাদের কয়েকজনের সঙ্গে সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তাদের মাধ্যমে বিএমডিএর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ নির্দিষ্ট ঠিকাদার বা প্রতিষ্ঠানের হাতে পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো দুদকের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানে অভিযোগের সত্যতা, সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা এবং আর্থিক লেনদেনের কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না—জিজ্ঞাসাবাদ ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাইয়ের পরই তা স্পষ্ট হবে।
বিএমডিএর অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে তিনজন সহকারী প্রকৌশলীকে চলতি দায়িত্বে নির্বাহী প্রকৌশলী করা হয়। গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রভাবশালী মহলের সুপারিশ ও ঘনিষ্ঠতার কারণে তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল—এমন অভিযোগও রয়েছে। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই প্রয়োজন।
দুদকের তলব পাওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী এনামুল কাদির গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি দুদকের চিঠি পেয়েছেন। তবে সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
এনামুল কাদির বলেন, ‘এখানে অনেক কাদা ছোড়াছুড়ি চলছে। কেউ হয়তো আমার নাম দিয়েছে। সে কারণেই আমাকে ডাকা হয়েছে।’
দুদকের তলব পাওয়া নির্বাহী প্রকৌশলী সানজিদা খানম মলি মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘সাবেক কৃষিমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। যারা প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ছিলেন, মূলত তাদেরই মন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ ছিল বা থাকে। কিন্তু আমার মতো একজন সহকারী প্রকৌশলীর, যিনি কোনো দিন টেন্ডার করেননি বা কোনো চেকে স্বাক্ষর করেননি, মন্ত্রীর সঙ্গে এ ধরনের কাজের কোনো সুযোগ ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘এখানে কয়েকটি গ্রুপে বিভক্তি রয়েছে। তারা মূলত একে অপরের বিরুদ্ধে অনেক কাদা ছোড়াছুড়ি করেছে।’
দুদকের তলবের বিষয়ে সানজিদা খানম মলি বলেন, ‘দুদক ডেকেছে মানেই কেউ দোষী—বিষয়টি এমন নয়। দুদকের অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো অভিযোগকে প্রমাণিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা জানেন, নারীদের কর্মক্ষেত্রে কাজ করা কতটা কঠিন। একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাকে হেয় করতে মিথ্যা অভিযোগ দিয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে প্রকৃত তথ্য উঠে আসবে এবং আমার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সঠিক নিষ্পত্তি হবে বলে আশা করছি।’
বিএমডিএ উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও সেচনির্ভর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সংস্থা। সংস্থাটির বিভিন্ন প্রকল্পে সরকারি অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ঠিকাদার, প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে সাবেক এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের অনুসন্ধানে একসঙ্গে নয় নির্বাহী প্রকৌশলীকে ‘অভিযোগ সংশ্লিষ্ট’ হিসেবে তলবের ঘটনায় বিএমডিএর প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও ঠিকাদারি প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এখন ১২ ও ১৩ আগস্টের জিজ্ঞাসাবাদে প্রকৌশলীরা কী তথ্য দেন, তাদের বক্তব্যের সঙ্গে প্রকল্পের নথি ও আর্থিক লেনদেনের তথ্যের কতটা মিল পাওয়া যায় এবং অভিযোগে উল্লেখিত অর্থের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—সেদিকেই নজর থাকবে।
তবে দুদকের অনুসন্ধান শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগকে প্রমাণিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে কমিশন।




Comments