অনুপ্রেরণায় জুলাই - চব্বিশ
ট্রেনের কামরায় ফিরে এলো ২০২৪ এর দিনগুলো
২০২৪-এর জুলাই স্মরণে
জুলাই ২০২৬। গভীর রাত। ঠাকুরগাঁওগামী ট্রেনটি ধীরে ধীরে বিমানবন্দর স্টেশন ছেড়ে এগিয়ে চলেছে। বেশিরভাগ যাত্রীই ঘুমিয়ে পড়েছেন। জানালার বাইরে অন্ধকারের বুক চিরে ছুটে যাচ্ছে আলোর রেখা। ট্রেনের একটি কামরায় হঠাৎই দুইজনের চোখাচোখি হলো।
— "আশিক?"
— "বাবুল! তুই?"
এক মুহূর্তের নীরবতার পর দুজন একে অপরকে জড়িয়ে ধরল।
সাত বছর আগে, ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্যসেন হলের একই রুমে উঠেছিল তারা। ২০২৫ সালে পড়াশোনা শেষ করে যে যার মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। গত এক বছরে ব্যস্ততার কারণে দেখা-সাক্ষাৎও আর হয়নি। ট্রেনের সিটে পাশাপাশি বসতেই শুরু হলো স্মৃতির ঝাঁপি খোলা।
বাবুল হেসে বলল, "মনে আছে, আমাদের রুমের ফ্যানটা কী বিশ্রী শব্দ করত! পরীক্ষার আগের রাতে তুই বলতিস—এই ফ্যানের আওয়াজও নাকি পড়ার সংগীত!" আশিক হেসে মাথা নাড়ল। পাল্টা মনে করিয়ে দিল, "আর তুই? সারারাত গ্রাফিকস আর ব্যানারের ডিজাইন নিয়ে বসে থাকতিস।"
হাসির রেশ মিলিয়ে যেতেই দুজনের মুখে হঠাৎ এক অন্যরকম গাম্ভীর্য নেমে এল। স্মৃতিতে ফিরে এল ২০২৪ সালের সেই উত্তাল জুলাইয়ের দিনগুলো।
আশিক জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, "আমার কাজ ছিল মাইক ভাড়া করা। শুনতে যত সহজ, তখন কাজটা তত সহজ ছিল না। একটা ফোন করলেই তো এখন মাইক পাওয়া যায়, কিন্তু আসল সমস্যা ছিল কখন, কোথায় আর কীভাবে সেই মাইক আমাদের কাছে পৌঁছাবে—সবটা সামলানো।"
বাবুল একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে যোগ করল, "আর আমার কাজ ছিল ব্যানার। একটা শব্দের বানান নিয়েই কত তর্ক হতো আমাদের মধ্যে! একটা অক্ষর ভুল হলে সবাই ছবি তুলে দেখিয়ে দিত। তাই প্রিন্ট হওয়ার আগে আমরা পাঁচজন মিলে বানান মেলাতাম। তুই তো রীতিমতো অভিধান খুলে বসতিস!"
"সবচেয়ে কঠিন ছিল ব্যানার ছাপানো না, বরং সেটা নিরাপদে নিয়ে আসা," বাবুল স্মৃতি হাতড়ে বলল। "প্রিন্টিং প্রেসে গিয়ে নিজের নামও বলতাম না। কখনো বলতাম এটা জন্মদিনের ব্যানার, কখনো সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামের। ব্যানার ভাঁজ করে এমনভাবে ব্যাগে ঢোকাতাম যেন মনে হয় সাধারণ কাপড়। নির্ধারিত সময়ের আগে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারলে পুরো পরিকল্পনাই বদলে যেত।"
আশিক মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, "মাইক নিয়েও একই অবস্থা ছিল। শেষ মুহূর্তে যদি গাড়ি না আসত, তবে পুরো কর্মসূচি আটকে যেত। কতবার যে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হয়েছে! আজ ভাবলে অবাক লাগে, একটা মাইক ঠিক সময়ে পৌঁছানোর জন্যও কতজনের সমন্বয় লাগত।"
এরই মধ্যে ট্রেনের কামরায় চায়ের হকার এল। "দুই কাপ চা দেব?"
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বাবুল মৃদু হেসে বলল, "মনে আছে, কাজ শেষ করে আমরা যখন রাতে হলে ফিরতাম, মনে হতো যেন একটা বড় যুদ্ধ জয় করে ফিরছি। রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বলতাম—কাল আবার নতুন কাজ।"
ট্রেনের গতি একটু কমে এল। পরের স্টেশনে বাবুলের নামার কথা। ব্যাগ কাঁধে তুলে দাঁড়িয়ে সে বলল, "জীবনে অনেক কিছু বদলে গেছে আশিক। কিন্তু সূর্যসেন হলের সেই রুমটা, রাত জেগে পরিকল্পনা করা আর আমাদের এই বন্ধুত্ব—এগুলো কখনো বদলাবে না।"
আশিক হাত বাড়িয়ে দিল। "আবার যেন দেখা হতে এত সময় না লাগে।"
বাবুল হাত মেলাল। "দেখা হবেই। কারণ কিছু বন্ধুত্বের ঠিকানা বদলায়, কিন্তু দূরত্ব তৈরি হয় না।"
ট্রেন থামল। বাবুল নেমে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়াল। ট্রেন আবার ধীরে ধীরে চলতে শুরু করলে আশিক জানালার পাশে বসে দেখল, বন্ধুটি হাত নাড়ছে। অন্ধকারের মধ্যে স্টেশনটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। কিন্তু সূর্যসেন হলের সেই ছোট্ট রুম, রাতভর গল্প, হাসি, দুশ্চিন্তা আর একসঙ্গে কাটানো দিনগুলোর স্মৃতি—সেগুলো আর কখনো হারিয়ে গেল না।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments