Image description

১৮ জুলাই, ২০২৪।
সকাল থেকেই শহরের বাতাস ভারী। কোথাও সাইরেন, কোথাও ধোঁয়া, কোথাও ছুটে চলা মানুষ। দুপুরের পর থেকে আর কোনো খবর নেই রাফির। ফোন বন্ধ। মেসেজে শুধু শেষ একটি লাইন— "আপু, চিন্তা কোরো না। একজন আহতকে হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছি।" এরপর নীরবতা।

রাফির বড় বোন মেহরীন প্রথমে ভাবল, হয়তো নেটওয়ার্ক নেই। কিন্তু বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, তারপর রাত—কোনো খবর নেই। মায়ের চোখে ঘুম নেই, বাবা বারবার দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। পরদিন ভোরেই মেহরীন বেরিয়ে পড়ল।

প্রথম হাসপাতাল। জরুরি বিভাগের সামনে মানুষের ভিড়।
— "এই নামে কেউ ভর্তি আছে?"
রেজিস্টার দেখে নার্স মাথা নাড়লেন।
— "না, নেই।"

দ্বিতীয় হাসপাতাল। তৃতীয়। চতুর্থ...
প্রতিটি হাসপাতালের সামনে একই দৃশ্য—রক্তমাখা কাপড়, উদ্বিগ্ন স্বজন, স্বেচ্ছাসেবকদের ছুটে চলা। কেউ পানির বোতল বিলিয়ে দিচ্ছে, কেউ ওষুধ কিনে দিচ্ছে, কেউ অচেনা আহতের জন্য রক্তদাতা খুঁজছে। একজন বৃদ্ধ মেহরীনের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— "মা, কিছু খেয়েছ?"
মেহরীন শুধু মাথা নাড়ল। বৃদ্ধ নিজের হাতে বিস্কুট আর এক বোতল পানি এগিয়ে দিলেন।
— "ভাইকে খুঁজে পাবে। আগে একটু খাও।"
চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারল না সে। প্রথম দিন শেষ হলো। সাতটি হাসপাতাল ঘুরেও কোনো সন্ধান নেই।

দ্বিতীয় দিন।
মেহরীন এখন হাসপাতালের করিডোর চিনে ফেলেছে। কোথায় জরুরি বিভাগ, কোথায় আইসিইউ, কোথায় অস্থায়ী তথ্যকেন্দ্র—সব মুখস্থ। অষ্টম হাসপাতাল। নবম। দশম।

এক জায়গায় স্বেচ্ছাসেবক বললেন,
— "ছবি দেখান। আমরা বিভিন্ন হাসপাতালে যোগাযোগ করি।"
ছবি তুলে রাখা হলো। অন্য হাসপাতালে একজন ইন্টার্ন ডাক্তার বললেন,
— "অনেকেই নিজেদের নাম না লিখিয়ে অন্যদের চিকিৎসা করাচ্ছে। তাই খুঁজে পাওয়া কঠিন।"
মেহরীন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— "নিজের চিকিৎসা না করে?"
ডাক্তার মৃদু হেসে বললেন,
— "হ্যাঁ। অনেকেই আগে বন্ধুকে বাঁচাতে ব্যস্ত।"

সেদিন মোট চৌদ্দটি হাসপাতাল ঘুরেও রাফির দেখা মিলল না। রাতে বাড়ি ফিরে মা শুধু বললেন,
— "ও বেঁচে আছে তো?"
মেহরীন উত্তর দিতে পারল না। শুধু মায়ের হাত শক্ত করে ধরে রইল।

তৃতীয় দিন।
ক্লান্ত শরীর। চোখ লাল। তবু আশা ছাড়েনি। পনেরো... ষোলো... সতেরো... আঠারো... উনিশ নম্বর হাসপাতাল থেকেও ফিরতে হলো। এবার শেষ চেষ্টা।

বিশ নম্বর হাসপাতাল।
করিডোরে ঢুকতেই মেহরীন দেখল, এক কোণে মেঝেতে বসে একজন ছেলের মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা। আর তার পাশে বসে আছে আরেকজন—কাঁধে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ, চোখে তিন রাতের নির্ঘুম ক্লান্তি। মেহরীন প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারল না।
— "রাফি!"
ছেলেটি ঘুরে তাকাল।
— "আপু!"

দুজনেই দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল একে অপরকে। মেহরীন কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— "তুই কোথায় ছিলি? আমরা পাগলের মতো খুঁজছি!"
রাফি মাথা নিচু করে বলল,
— "সেদিন গুলিতে ও আহত হয়।" পাশে বসা বন্ধুর দিকে ইশারা করল। "সব হাসপাতালে জায়গা পাচ্ছিলাম না। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরেছি। শেষে এখানে ভর্তি করাতে পেরেছি।"

— "তোর ফোন?"
— "রক্তে ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। চার্জও ছিল না। কারও ফোন চেয়ে করার সুযোগই পাইনি।"

মেহরীন এবার খেয়াল করল, রাফির নিজের হাতেও গভীর ব্যান্ডেজ।
— "তুই নিজেও আহত!"
রাফি হেসে বলল,
— "সামান্য। আগে ওকে বাঁচানো দরকার ছিল।"

ঠিক তখনই একজন নার্স এসে বললেন,
— "রোগীর জন্য এই ইনজেকশনটা এখনই লাগবে।"
রাফি পকেট হাতড়ে চুপ করে রইল। তার কাছে আর টাকা নেই। মেহরীন কিছু বলার আগেই পাশের বেঞ্চে বসে থাকা এক অচেনা মানুষ উঠে এসে কাউন্টারে টাকা জমা দিলেন।
— "ভাইয়ের চিকিৎসা আগে হোক।"
রাফি অবাক হয়ে বলল,
— "আপনি কে?"
লোকটি মৃদু হেসে উত্তর দিলেন,
— "আজকে আমরা সবাই একে অপরের আপন মানুষ।"

করিডোরে তখন আরও কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক রক্তদাতার খোঁজ করছেন। কেউ খাবারের প্যাকেট দিচ্ছেন, কেউ আহতদের স্বজনদের হাতে পানি তুলে দিচ্ছেন। ক্লান্ত মুখগুলোর মাঝেও এক ধরনের নীরব মানবিকতা ছড়িয়ে আছে।

মেহরীন ভাইয়ের হাত শক্ত করে ধরে বলল,
— "চল, এবার বাড়ি ফিরবি।"
রাফি বন্ধুর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,
— "ও একটু সুস্থ হলেই ফিরব। ওর বাড়ির লোক এখনো আসতে পারেনি।"
মেহরীন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ভাইয়ের কাঁধে হাত রেখে বলল,
— "ঠিক আছে। তাহলে আমিও থাকি। একজন নয়, দুজনের দেখাশোনা করব।"

হাসপাতালের জানালা দিয়ে সকালের আলো ধীরে ধীরে করিডোরে ঢুকে পড়ছিল। তিন দিন ধরে প্রায় বিশটি হাসপাতাল ঘুরে যে ভাইকে সে খুঁজে পেয়েছিল, সে শুধু তার ছোট ভাই নয়—এক আহত বন্ধুর পাশে শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা এক ‘মানুষ’ও।

মানবকণ্ঠ/ডিআর