Image description

পরিচয় গোপন করে দীর্ঘ সাড়ে চার দশক ধরে ফেরারি জীবন কাটাচ্ছিলেন তিনি। রূপ বদলেছিলেন, বদলেছিলেন নাম ও ঠিকানা। কিন্তু অপরাধের চিহ্ন যে প্রকৃতির নিয়মেই রয়ে যায়, তা আরও একবার প্রমাণিত হলো। অবশেষে ডিবির চৌকশ টিমের পাতা নিখুঁত জালে আটকা পড়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের অন্যতম প্রধান খুনি মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন।

মৃত্যু পরোয়ানাভুক্ত এই ধূর্ত আসামিকে রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানী ডিওএইচএসের একটি বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারের পর প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে এই মোস্ট ওয়ান্টেড আসামির অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য ছিল না। তবে ডিবির হাতে ছিল মাত্র দুটি অবিশ্বাস্য ক্লু! প্রথমত, মোজাফফরের মেয়ের এয়ারটেল অফিসে চাকরি করা এবং দ্বিতীয়ত, মোজাফফরের নাকের নিচে থাকা একটি বড় জন্মগত কালো তিল বা আঁচিল। এই সামান্য সূত্র ধরে মাসের পর মাস ছদ্মবেশে মেয়ের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে ডিবি। একপর্যায়ে বনানী ডিওএইচএসের একটি সম্ভাব্য বাড়ি চিহ্নিত করেন গোয়েন্দারা।

বুধবার গভীর রাতে ডিবির একটি বিশেষ দল ছদ্মবেশে ওই বাসার দরজায় কড়া নাড়ে। ভেতর থেকে এক বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি দরজা খুললে গোয়েন্দারা অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের ‘এয়ারটেল অফিসের কর্মী’ পরিচয় দেন এবং মেয়ের খোঁজ করেন। এত রাতে অফিসের লোক দেখে কৌতূহলী ও সন্দিহান হয়ে বৃদ্ধ জানতে চান, “এত রাতে অফিসের কাজ কেন? আমাকে বলুন কী বিষয়।”

সেই মুহূর্তে ডিবির তীক্ষ্ণ চোখ এড়ায়নি অল্প আলোতেও বৃদ্ধের নাকের নিচে থাকা সেই পরিচিত কালচে তিলটি। গোয়েন্দারা কৌশলগতভাবে বলেন, “মুরব্বি, আমরা তো আপনাকে চিনি না, আপনি কে?” সরল বিশ্বাসে ও কিছুটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বৃদ্ধ জবাব দেন, “আমি মোজাফফর। মেয়ের বাবা।” মুখ থেকে ‘মোজাফফর’ নামটা বের হওয়ার সাথে সাথেই পলকে পকেট থেকে বেরিয়ে আসে ডিবির হ্যান্ডকাফ। চোখের পলকে অবসান ঘটে ৪৫ বছরের পলাতক জীবনের।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তার চালানো সামরিক অভ্যুত্থানের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন এই মেজর মোজাফফর। তিনি ছিলেন কিলিং স্কোয়াডের সরাসরি সক্রিয় সদস্য। সার্কিট হাউজের সেই কালরাতে তিনি ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন সরাসরি রাষ্ট্রপতির কক্ষের দিকে অগ্রসর হন। মোজাফফরই সশরীরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে কক্ষের বাইরে এনে শনাক্ত করেন এবং ঠান্ডা মাথায় তার ওপর গুলি চালান।

হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পরপরই মোজাফফর তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে ফোনে সেই ঐতিহাসিক বার্তাটি দিয়েছিলেন,“দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিল্ড”। পরবর্তীতে সামরিক তদন্তের পর দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় যে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি (ফাঁসি) দেওয়া হয়েছিল, মোজাফফর ছিলেন তাদের অন্যতম।

১৯৮১ সালের ৩১ মে সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে মোজাফফর ও তার সহযোগী মেজর এসএম খালেদ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। নিজেকে আড়াল করতে তিনি নিজের আসল পরিচয় সম্পূর্ণ মুছে ফেলেন। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে জাল নথির সাহায্যে ভুয়া নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট তৈরি করেন। এই জাল পাসপোর্টের ওপর ভর করে তিনি বিশ্বের একাধিক দেশ সফর ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে আশ্রয় নিয়েছিলেন। যার ফলে ইন্টারপোল বা বাংলাদেশের গোয়েন্দারাও এতদিন তার আসল নামে কোনো হদিস পায়নি। জীবনের শেষভাগে এসে তিনি অত্যন্ত গোপনে বাংলাদেশে ফিরে বনানী ডিওএইচএসে একজন সাধারণ, রাজনীতিবিমুখ প্রবীণ নাগরিক হিসেবে বসবাস শুরু করেছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না।

ডিএমপি ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি সাবেক সামরিক কর্মকর্তা হওয়ায় প্রয়োজনীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে সেনাবাহিনীর নিজস্ব জুডিশিয়াল প্রসেসের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।