Image description

তিন ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দায়িত্ব পালন করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিদায়ের ক্ষণ ঘনিয়ে এসেছে বলে জোর আলোচনা চলছে। দীর্ঘদিন ধরে তার পদত্যাগ কিংবা অপসারণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা গুঞ্জন থাকলেও এবার তা বাস্তবে রূপ নিতে পারে বলে জানিয়েছেন বঙ্গভবন, সরকার এবং বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাষ্ট্রপতি শারীরিক অসুস্থতাকে কারণ দেখিয়ে যেকোনো সময় পদত্যাগ করতে পারেন। 

এদিকে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা নিয়ে সরকার ও বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি অংশ দেশের ২৩তম সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে ড. ওসমান ফারুকের ওপর আস্থা রাখতে চাইছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, বিশ্বব্যাংকে উচ্চপদে দীর্ঘ কর্মজীবন, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান এবং দলের প্রতি দীর্ঘদিনের আনুগত্য—সব মিলিয়ে ওসমান ফারুককে গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। 

ড. মুহম্মদ ওসমান ফারুক ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে দীর্ঘদিন বিশ্বব্যাংকে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে বিশ্বব্যাংকের চাকরি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন। ওই বছর কিশোরগঞ্জ-৪ (করিমগঞ্জ-তাড়াইল) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

এছাড়া সম্ভাব্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের জ্যেষ্ঠ নেতা খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও আবদুল মঈন খান ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্বে থাকা একজন সচিবের নামও আলোচনায় রয়েছে। 

ক্ষমতার মেরুকরণ ও বঙ্গভবন-সরকার দূরত্ব: ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দায়িত্ব গ্রহণ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ ইতোমধ্যে তিন বছরের বেশি সময় অতিক্রম করেছে। তবে গত জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্বাচিত এই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবি বেশ জোরদার হয়ে ওঠে। তত্কালীন সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে একাধিকবার বঙ্গভবন ঘেরাওসহ কঠোর কর্মসূচি পালন করা হয়। পরবর্তীতে বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠন হলে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা নিয়ে নানা হিসাব-নিকাশ শুরু হয়। শুরুতে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে সরকার তাকে পদ থেকে সরানোর বিষয়ে কিছুটা ইতিবাচক অবস্থান নিলেও সম্প্রতি লন্ডন সফরকে কেন্দ্র করে বঙ্গভবনের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব চরম আকার ধারণ করে। 

অভিযোগ ওঠে, যুক্তরাজ্য সফরকালে তিনি ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন। এরপরই সম্পর্কের অবনতি দৃশ্যমান হয়। এমনকি গত ১১ জুন রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশন প্রত্যক্ষ করতে গেলে সরকারের দায়িত্বশীল কোনো প্রতিনিধি তার সঙ্গে সাক্ষাত্ করেননি বলেও খবর বের হয়। আস্থার চরম সংকট এবং স্বাস্থ্যগত অবক্ষয় সব মিলিয়েই এখন তার ইস্তফা দেয়া কেবল সময়ের ব্যাপার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 

যে কোনো সময় পদত্যাগ: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সেই সময় থেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে পদে রাখা হবে কি না, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষ রাষ্ট্রপতির অপসারণের দাবি তোলে। তবে সাংবিধানিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক সমঝোতার কারণে তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ বা অপসারণের আলোচনা পুরোপুরি থামেনি। বরং নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বিষয়টি আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এবার সেই আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। 

রাষ্ট্রপতির স্বাস্থ্যগত পরিস্থিতির বিষয়টি নিয়েও একাধিক সূত্র তথ্য দিয়েছে। জানা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে তার ওপেন হার্ট সার্জারি হয়। এরপর চিকিত্সকদের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা চলছিল। চলতি বছরের ১২ মে যুক্তরাজ্যে স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময় তার হূদযন্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্লক ধরা পড়ে। পরে জরুরি ভিত্তিতে এনজিওপ্লাস্টি করে স্টেন্ট বসানো হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এটিই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এসব শারীরিক জটিলতার কারণেই পদত্যাগের সিদ্ধান্ত সামনে আসতে পারে। 

২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। সংবিধান অনুযায়ী তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৮ সালের এপ্রিলে। তবে তিনি দায়িত্ব ছাড়লে নির্ধারিত সময়ের আগেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ৬ সেপ্টেম্বর রবিবার জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন বসতে পারে। ওই অধিবেশনেই দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতে পারেন।

সম্মানজনক বিদায় চান চুপ্পু: বঙ্গভবনের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রাষ্ট্রপতি সব সময় সম্মানজনকভাবে দায়িত্ব থেকে বিদায় নিতে চেয়েছেন। বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থাও আগের মতো নেই। ওপেন হার্ট সার্জারির পরও নিয়মিত চিকিত্সা চলছে। তিনি সুন্দর ও সম্মানজনকভাবে দায়িত্ব ছেড়ে যেতে চান। সরকারও বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিকল্পনাও রয়েছে। এদিকে নিজের পদত্যাগ প্রসঙ্গে এর আগে এক একান্ত আলোচনায় রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ‘দেশের সর্বোচ্চ পদে আছি। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে থেকে রাষ্ট্রের কল্যাণে যতটুকু করার সর্বোচ্চটা করার চেষ্টা করেছি। এখন সম্মানের সঙ্গে যেতে চাই। সরকার যখন বলবে, আমি বঙ্গভবন ছাড়তে প্রস্তুত।’ 

স্পিকার সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন: সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে অথবা তিনি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদের স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন বসতে পারে। ওই অধিবেশনেই দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়া হতে পারে। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হবে। যেহেতু বর্তমান জাতীয় সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তাই দলটির মনোনীত প্রার্থীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

যা বলা হচ্ছে সরকারের তরফ থেকে: রাষ্ট্রপতির এই সম্ভাব্য পদত্যাগের বিষয়টিকে কেন্দ্র করে গুঞ্জন জোরালো হলে বিষয়টিতে মন্তব্য করেছেন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানিয়েছেন, স্বাস্থ্যগত সমস্যাসহ যেকোনো কারণে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে চাইলে সংবিধানে সেই সুযোগ রয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘গুঞ্জন তো গুঞ্জনই। ঘটনা যদি সত্যি হয়, তাহলে আমরা তা দেখব।’ তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, ‘রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিকভাবে পদত্যাগ করতে চাইলে তিনি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠাবেন। তিনি পদত্যাগ করলে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হবেন, তা সময়ই বলে দেবে।’