Image description

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কার্যকর বিরোধী শক্তির প্রশ্নটি আবারও আলোচনায় এসেছে। সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে থাকা জামায়াতে ইসলামী সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমিকা রাখতে পারছে না—এমন অভিযোগ তুলে মধ্যপন্থি, বামপন্থি এবং কওমিভিত্তিক কয়েকটি রাজনৈতিক দল বিকল্প বিরোধী শক্তি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের লক্ষ্য— সংসদ ও রাজপথে এমন একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা, যা সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে এবং একই সঙ্গে জামায়াতের রাজনৈতিক প্রভাবেরও বিকল্প হয়ে উঠবে।

সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে থাকা কয়েকটি গণতান্ত্রিক দল ইতোমধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে মতবিনিময় শুরু করেছে। অন্যদিকে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে এক ছাতার নিচে এনে জামায়াতের বিকল্প ইসলামী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ার চেষ্টা করছে হেফাজতে ইসলাম। দুই ধারার উদ্যোগ আলাদা হলেও রাজনৈতিক লক্ষ্য এক জামায়াতকে টেক্কা দিয়ে নিজেদের কার্যকর বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। 

রাজনৈতিক নেতাদের অভিযোগ, বর্তমান সংসদে জামায়াতে ইসলামী অনেক ক্ষেত্রে সরকারের কঠোর সমালোচনার পরিবর্তে সহযোগিতামূলক অবস্থান নিয়েছে। ফলে সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলের যে ভূমিকা থাকার কথা, সেটি দৃশ্যমান নয়। তাদের মতে, সরকারের নীতিগত ভুল, জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত কিংবা অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে জোরালো রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে দলটি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রতিদ্বন্দ্বিতাই বিরোধী রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর এবং দলটির জনসমর্থন কমে যাওয়ায় সেই জায়গায় একটি রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত এখনো সেই শূন্যতা পূরণ করতে পারেনি। এই বাস্তবতায় বিকল্প রাজনৈতিক জোট গঠনের আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে। 

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, জামায়াতের বর্তমান অবস্থান অনেকটাই সরকারি দলের সহযোগীর মতো। তার ভাষ্য, সমমনা গণতান্ত্রিক দলগুলোর সমন্বয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও তিনি মনে করেন, এমন উদ্যোগ বাস্তবায়নে এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। 

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম সদস্য রুহিন হোসেন প্রিন্সও কার্যকর বিরোধী শক্তির অভাবের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, শিল্পখাতে গ্যাস সংকট, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, হত্যা ও মাদক পরিস্থিতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। একই সঙ্গে বিরোধী দলও এসব প্রশ্নে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। এ কারণে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোকে নিয়ে বিকল্প রাজনৈতিক জোট গঠনের আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকও মনে করেন, দেশে কার্যকর বিরোধী দলের শূন্যতা স্পষ্ট। তার মতে, সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়নের জন্য সময় প্রয়োজন হলেও রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় শক্তিশালী বিরোধী জোটের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

এদিকে ইসলামী রাজনীতির ভেতরেও নতুন সমীকরণ তৈরির চেষ্টা চলছে। হেফাজতে ইসলাম কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক দলগুলোকে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ ইসলামী প্ল্যাটফর্ম গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, সরকারের জনস্বার্থবিরোধী যেকোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হবে এবং প্রয়োজন হলে অন্য গণতান্ত্রিক দলগুলোর সঙ্গেও যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেয়া হতে পারে। 

তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জামায়াত সবসময় গঠনমূলক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। দেশের স্বার্থে সরকারের ইতিবাচক উদ্যোগকে সমর্থন করা এবং জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের বিরোধিতা দুই ক্ষেত্রেই দলটি সক্রিয় রয়েছে। তিনি দাবি করেন, জুলাই সনদ, গণভোটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে জামায়াত সংসদ ও রাজপথ উভয় জায়গায় কর্মসূচি পালন করেছে। 

অন্যদিকে বিএনপিও সম্ভাব্য বিরোধী জোট গঠনের আলোচনা ইতিবাচকভাবে দেখছে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গঠনমূলক সমালোচনা স্বাভাবিক বিষয়। সরকারের কোনো ভুল থাকলে বিরোধী দল সেটি তুলে ধরবে এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। বিএনপি এমন সমালোচনাকে স্বাগত জানাবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম আলী রেজা মনে করেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিকল্প বিরোধী শক্তি গড়ে ওঠা অস্বাভাবিক নয়। তবে কেবল রাজনৈতিক জোট গঠন করলেই হবে না, জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করে তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে। তার মতে, সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের অন্ধ বিরোধিতা নয়, বরং গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলেই একটি কার্যকর বিরোধী শক্তি দেশের গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে সক্ষম হবে।