ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির প্রথম ধাপে ৪১ লাখ পরিবারের জন্য কার্ড তৈরিতে প্রায় ২৪৬ কোটি টাকা ব্যয় হবে। প্রতিটি কার্ড তৈরিতে ৬০০ টাকা করে খরচ ধরা হয়েছে। তবে এই অর্থ সরকারের তহবিল থেকে দেওয়া হবে, নাকি অন্য কোনোভাবে ব্যয় নির্বাহ করা হবে—এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি শিগগিরই নিষ্পত্তি করা হবে বলে জানিয়েছে অর্থ বিভাগ।
কার্ড তৈরির খরচের পাশাপাশি ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, অর্থ স্থানান্তর ও মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহারের জন্যও আলাদা চার্জ রয়েছে। ফলে ৪১ লাখ পরিবারকে মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি পুরো ডিজিটাল বিতরণ ব্যবস্থায় সরকারের মোট ব্যয় কত হবে, তা নিয়েও নতুন করে হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ বিতরণে টাকাপে ব্যবস্থা ব্যবহার এবং এর সঙ্গে সরকারি তফসিলি ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করার বিষয়ে মঙ্গলবার সচিবালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অর্থ বিভাগ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও বৈঠকে অংশ নেন।
অর্থ বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি কার্ড তৈরির ৬০০ টাকা সরকার বহন করবে, নাকি অন্য কোনো মাধ্যমে এই ব্যয় নির্বাহ করা হবে—তা এখনো নির্ধারণ হয়নি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।
সরকার চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রথম ধাপে ৪১ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পরিবারপ্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে। এ কর্মসূচির জন্য চলতি অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
শুধু কার্ড তৈরির হিসাবেই সরকারের সামনে এখন ২৪৬ কোটি টাকার ব্যয়ের বিষয়টি এসেছে। এর সঙ্গে প্রশাসনিক ও লেনদেন ব্যয় যুক্ত হলে কর্মসূচির মোট খরচ আরও বাড়বে।
অর্থ বিভাগের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের মূল লক্ষ্য দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারকে সরাসরি সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া। তাই কার্ড তৈরির খরচের কারণে সুবিধাভোগীদের ওপর নতুন কোনো আর্থিক চাপ তৈরি হবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
এর আগে সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন জানিয়েছিলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। কার্ড দেওয়ার নামে কোথাও টাকা দাবি করার সুযোগ নেই। কেউ টাকা দাবি করলে তা প্রতারণা হিসেবে বিবেচিত হবে এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
টাকাপের মাধ্যমে যাবে সহায়তার অর্থ
ফ্যামিলি কার্ডের অর্থ বিতরণে টাকাপে ব্যবহারের পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য হলো নিরাপদ ও নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। সংশোধিত সভার নোটিশে টাকাপে ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের আন্তঃসংযোগের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ব্যবস্থায় সুবিধাভোগীর হাতে সরাসরি নগদ অর্থ তুলে দেওয়ার পরিবর্তে নির্ধারিত ব্যাংক হিসাব বা ডিজিটাল আর্থিক সেবার মাধ্যমে অর্থ পাঠানো হবে। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর সুযোগ কমার পাশাপাশি সরকারি সহায়তা সরাসরি সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়বে।
রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ডধারীদের হিসাব পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি টাকাপে কার্ড ব্যবহার করে বিকাশ, নগদ ও রকেটের মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের সুযোগ থাকবে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বৈঠক শেষে বলেছেন, ফ্যামিলি কার্ড সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার কর্মসূচি। এটি বাস্তবায়নে বাজেট কোনো বাধা হবে না; প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ দেওয়া হবে। তাঁর মতে, এটি শুধু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নয়, নারীর ক্ষমতায়ন এবং গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়ার একটি মানবিক উদ্যোগ।
চার বছরে ৯৬০ কোটি টাকার কার্ড ব্যয়
আগামী চার বছরে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। প্রতিটি কার্ড তৈরিতে ৬০০ টাকা করে ব্যয় হলে ১ কোটি ৬০ লাখ কার্ড তৈরিতেই প্রায় ৯৬০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
অর্থাৎ প্রথম ধাপের ৪১ লাখ কার্ড তৈরির ২৪৬ কোটি টাকার হিসাব সামনে আসার পর পুরো কর্মসূচির কার্ড তৈরির ব্যয়ও এখন বড় আর্থিক হিসাব হিসেবে বিবেচনায় আসছে।
এসএস




Comments