চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছরের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে দেওয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে এ বিষয়ে চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড আগামী ১৫ বছর এনসিটি পরিচালনা করবে। প্রতিষ্ঠানটি টার্মিনাল ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে মাশুল আদায় করবে। বিনিময়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে এককালীন অর্থের পাশাপাশি প্রতিটি কনটেইনারের জন্য নির্ধারিত মাশুল দেবে। তবে চুক্তির আর্থিক ও অন্যান্য বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করেনি সরকার।
এ চুক্তি হলে এনসিটি হবে বিদেশি অপারেটরের কাছে হস্তান্তর করা চট্টগ্রাম বন্দরের তৃতীয় কনটেইনার টার্মিনাল। এর আগে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালস (আরএসজিটি)। আর লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে ডেনমার্কের মায়ের্সকের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এপিএম টার্মিনালস।
২০০৭ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয় প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এনসিটির। এখানে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী ও একটি ছোট কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানো যায়। টার্মিনালটি চালুর পর থেকে দেশীয় অপারেটরদের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। মূলত জাহাজে রপ্তানি কনটেইনার তোলা এবং জাহাজ থেকে আমদানি কনটেইনার নামানোর কাজ হয় এখানে।
দীর্ঘদিনের ইজারা প্রক্রিয়া
২০০৮ সালে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে এনসিটিতে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য বিশ্বের চারটি শীর্ষ বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রাথমিকভাবে বাছাই করা হয়েছিল। তালিকায় ছিল যুক্তরাজ্যের পিঅ্যান্ডও, যা পরে ডিপি ওয়ার্ল্ড অধিগ্রহণ করে। তবে পরে ওই নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিল হয়ে যায়।
এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এনসিটি ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া আবার শুরু হয়। ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি আবুধাবিতে দুবাই সরকার ও বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হয়। ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর ইজারা প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে এগিয়ে যায়।
২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রক্রিয়াটি আরও গতি পায়। কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়নের পর শুরু হয় দর-কষাকষি। গত ২৭ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে দর-কষাকষি চলে। তবে শ্রমিক আন্দোলন ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের খসড়া চুক্তি পর্যালোচনার জন্য অতিরিক্ত সময় চাওয়ায় তখন চুক্তি সই হয়নি।
ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্থগিত প্রক্রিয়াটি আবার এগিয়ে যায়। গত ৮ এপ্রিল যৌথ প্ল্যাটফর্মের সভার পর ডিপি ওয়ার্ল্ড নতুন প্রস্তাব দেয়। কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন শেষে দর-কষাকষি চূড়ান্ত হয়। পরে ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ১৫ বছরের জন্য বিদেশি অপারেটরের মাধ্যমে এনসিটি পরিচালনার রেয়াতি চুক্তির খসড়া নীতিগতভাবে অনুমোদন করে।
ইজারার বিরোধিতায় শ্রমিকদের আন্দোলন
এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেওয়ার বিরোধিতা করে শুরু থেকেই আন্দোলন করে আসছেন বন্দর শ্রমিক-কর্মচারীদের একটি অংশ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের ব্যানারে আন্দোলনের কারণে বন্দরে অচলাবস্থাও তৈরি হয়েছিল। তখন নির্বাচিত সরকারের অধীনে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
এখন নির্বাচিত সরকারের সময়েও ইজারা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করছেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। গত সোমবার অবস্থান কর্মসূচি থেকে বন্দর রক্ষা আন্দোলনের নেতারা হুঁশিয়ারি দেন, এনসিটি ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ বাতিল না হলে বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে। এর ধারাবাহিকতায় বুধবার বন্দর এলাকায় মশাল মিছিলও অনুষ্ঠিত হয়েছে।




Comments