Image description

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার মহিমাগঞ্জে ঢুকতেই এখন চোখে পড়ে এক অদ্ভুত নীরবতা। বিশাল ফটক আর সারি সারি পুরোনো স্থাপনাগুলো যেন কোনো এক হারিয়ে যাওয়া গৌরবের নীরব সাক্ষী। এক সময়ের কর্মচঞ্চল ‘রংপুর চিনিকল’ এখন প্রায় মৃত এক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের প্রতীক।

শনিবার (২ মে) সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, ছয় বছর ধরে বন্ধ থাকা এই চিনিকলকে কেন্দ্র করে স্তব্ধ হয়ে গেছে হাজারো পরিবারের জীবিকার চাকা, থমকে গেছে পুরো অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি।

১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর ১৯৫৭-৫৮ মৌসুমে উৎপাদন শুরু করেছিল এই চিনিকল। এক হাজার ৮৬২ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতির হৃৎস্পন্দন। যেখানে এক সময় আখ বোঝাই ট্রাক-ট্রলির দীর্ঘ সারি আর যান্ত্রিক গর্জনে মুখর থাকত চারপাশ, সেখানে এখন কেবলই হাহাকার। কারখানার ৩৫ একর এলাকা এখন জঙ্গলে ঢেকে গেছে। খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা কোটি কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি ও গাড়িগুলোতে মরিচা ধরে নষ্ট হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় এই সম্পদগুলো ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত লোহার স্তূপে পরিণত হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে শ্রমিকদের জীবনে। মিল বন্ধ হওয়ার পর চুক্তিভিত্তিক ও মৌসুমি শ্রমিকরা আজ দিশেহারা। যাদের শ্রমে-ঘামে উৎপাদনের চাকা ঘুরত, তাদের অনেকেই এখন জীবিকার তাগিদে ভ্যান চালাচ্ছেন বা দিনমজুরি করছেন। অনেক পরিবারে সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে, জোটেনি সুচিকিৎসার অর্থ। শ্রমিক নেতা ওসমান গনি আক্ষেপ করে বলেন, "কেবল একটি কারখানা বন্ধ হয়নি, বন্ধ হয়েছে বহু মানুষের স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার স্বাভাবিক পথ।"

আখ চাষিদের অবস্থাও তথৈবচ। মিল বন্ধ হওয়ার পর এই অঞ্চলে আখের চাষ প্রায় বিলুপ্তির পথে। কৃষকরা বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকলেও আখের মতো নিশ্চিত বাজার আর কোথাও পাচ্ছেন না। জনপদটি এখন গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে মিলটি বন্ধ করা হলেও দীর্ঘ ছয় বছরেও তার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

গতকাল ১ মে সারা বিশ্বে মহান মে দিবস পালিত হলেও মহিমাগঞ্জের শ্রমিকদের মাঝে কোনো আনন্দ ছিল না। তারা নিরবে বসে নিজেদের ভবিষ্যতের উত্তর খুঁজেছেন। বন্ধ চিনিকলটি সংস্কার করে দ্রুত চালু করার দাবি এখন এই জনপদের হাজারো মানুষের। তবে কারখানা এলাকা জনশূন্য থাকায় কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

মানবকণ্ঠ/ডিআর