উত্তরের জনপদ গাইবান্ধার এক নিভৃত পল্লীতে এক অনন্য বাতিঘর হয়ে জ্বলছেন ৭৮ বছর বয়সী লুৎফর রহমান। বয়স আশি ছুঁই-ছুঁই হলেও থামেনি তার শিক্ষার আলো ছড়ানোর মহৎ কর্ম। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে এলাকার সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মাত্র এক টাকার বিনিময়ে পাঠদান করে আসছেন তিনি। এলাকাবাসীর কাছে তিনি এখন ‘এক টাকার শিক্ষক’ হিসেবেই সমধিক পরিচিত।
শনিবার (১৬ মে) সকালে গাইবান্ধা সদর উপজেলার মদনেপাড়া গ্রামে মিনারা বেগমের বাড়ির উঠানে দেখা যায় এক অন্যরকম দৃশ্য। প্লাস্টিকের বস্তার ওপর গোল হয়ে বসে আছে একদল শিশু। পরম মমতা আর নানা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে তাদের পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছেন লুৎফর মাস্টার।
লুৎফর রহমানের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৩ নভেম্বর ফুলছড়ি উপজেলার মধ্য উড়িয়া গ্রামে। ১৯৭২ সালে গুণভরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করলেও চরম অর্থাভাবে তার উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন ভেঙে যায়। নিজে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হলেও শপথ নেন এলাকার গরিব ও ছিন্নমূল শিশুদের শিক্ষিত করার। সেই লক্ষ্যেই ১৯৭৫ সাল থেকে শুরু করেন শিক্ষকতা।
বর্তমানে লুৎফর রহমান সপরিবারে গাইবান্ধা শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামে একটি বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের ধারে জরাজীর্ণ টিনের ঘরে বসবাস করেন। নদী ভাঙনে একসময়ের সচ্ছল এই গৃহস্থ পরিবারটি সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব। বড় ছেলে ইজিবাইক চালান আর ছোট ছেলে ইসলামি ফাউন্ডেশনে যোগ দিলেও এখনো বেতন পাননি।
প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে চড়ে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে ছাত্র-ছাত্রীদের ডেকে আনেন তিনি। বাগুড়িয়া, মদনেরপাড়া, পুলবন্দি, চন্দিয়া, ঢুলিপাড়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় তিনি প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০ জন শিক্ষার্থীকে পড়ান। বিনিময়ে প্রতিদিন সম্মানী হিসেবে নেন মাত্র এক টাকা।
লুৎফর রহমান বলেন, “১৯৭৫ সালে যখন শুরু করি, তখন বিনা পয়সায় পড়াতাম। পরে অভিভাবকদের অনুরোধে এক টাকা নেওয়া শুরু করি। আজ ৫০ বছর পরও সেই এক টাকাই নিচ্ছি। টাকা আমার কাছে বড় নয়, দেশের কল্যাণে দরিদ্র শিশুদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।”
তার কাছে পড়ে আজ অনেকেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার কিংবা পুলিশ সদস্য হয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তার একজন প্রাক্তন ছাত্র বর্তমানে সদর উপজেলার দারুল হুদা আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “স্যারের অবদানের কথা কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। তার কারণেই আমার মতো শত শত শিক্ষার্থী শিক্ষার মুখ দেখেছে। সমাজে এমন নির্লোভ মানুষ বিরল।”
গোপীনাথপুর এলাকার অভিভাবক সাথি আক্তার বলেন, “আমি নিজেও স্যারের কাছে পড়েছি, এখন আমার সন্তানও তার কাছে পড়ে। আজও তিনি সেই এক টাকার বিনিময়েই সেবা দিচ্ছেন। এই যুগে এমন মানুষ পাওয়া সত্যি কঠিন। তাকে সরকারিভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া উচিত।”
গিদারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হারুন অর রশিদ ইদু বলেন, “লুৎফর মাস্টার একজন ব্যতিক্রমী এবং অত্যন্ত সাদা মনের মানুষ। সমাজ বদলে দিতে তার মতো এমন নিবেদিত প্রাণ আরও প্রয়োজন। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে আমরা সাধ্যমতো তার পাশে থাকার চেষ্টা করি।”
৫০ বছরের এই দীর্ঘ পথচলায় সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর জীবন আলোকিত করা লুৎফর মাস্টারের শেষ ইচ্ছা—তার ছাত্ররা যেন প্রকৃত মানুষ হয়ে দেশের সেবায় নিয়োজিত হয়।
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments