Image description

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতন হলেও সেই সরকারের ঘনিষ্ট দোসর মোহাম্মদ হোসাইন জনির প্রতিষ্ঠান ‘রেগনাম রিসোর্সেস’ এখনও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে (সওজ) রাম রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছে। পতিত আওয়ামী সরকারের প্রভাবশালীদের দুর্নীতি ও লুটপাটের এই সহযোগি বর্তমান সরকারের সময়েও সমান আধিপত্য বজায় রেখেছে। এমনকি ড. মুহাম্মদ ইউনূস নের্তৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও হাজার কোটি লোপাট করে নিয়েছে রেগনাম। সে সময় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়ে সওজকে  রেগনামের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া কথা বললেও নানা অজুহাতে সময়ক্ষেপণের মাধ্যমে বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন সওজ’র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। 
  
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অবশ্য প্রতিষ্ঠানটির অনিয়ম নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। শিগগিরই হয়তো খলের বেড়াল বেরিয়ে আসবে। তবে ঘুরেফিরে একটি প্রশ্নই সবার মনে উঁকি দিচ্ছে- সব সরকারের আমলেই সুবিধা পাওয়া রেগনাম রিসোর্সের খুটির জোর কোথায়? এত অনিয়ম, এত পরিমাণ টাকা নিত্যদিন লোপাট করে গেলেও কেন প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কোনো সরকারই জোরালো পদক্ষেপ নিচ্ছে না?  
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানবকণ্ঠের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সওজ’র সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বশীলদের ম্যানেজ করে এসব অপকর্ম চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। টোলে ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে যে টাকা আত্মসাৎ করা হয় এর ভাগ সংশ্লিষ্ট টোল প্লাজার দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে সওজ’র সিস্টেম এনালিস্টরাসহ উর্দ্ধতনদের পকেটেও যায়। যে কারণে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেয়ার কথা বললেও নিজস্ব লোকবলের সংকট এবং রেগনামের বিকল্প প্রতিষ্ঠান না থাকাসহ নানা অজুহাত দেখিয়ে কালবিলম্ব করে যাচ্ছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, চব্বিশের অভ্যুত্থানে হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার তিন মাস আগে মেঘনা-গোমতী টোলপ্লাজায় টোল আদায়ের কার্যাদেশ পায় ওবায়দুল কাদের, শামীম ওসমান ও মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি মোহাম্মদ হোসাইন জনির প্রতিষ্ঠান ‘রেগনাম রিসোর্সেস লিমিটেড’। ওই বছর ৬ এপ্রিল রেগনামের ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা। মেঘনা-গোমতীর দ্বিতীয় টোলপ্লাজার ১২টি বুথ থেকে টোল আদায় শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এর মধ্যে ৬টি বুথের টোল আদায় শুরু হয় ইটিসি পদ্ধতিতে। একেকটি টোল আদায়ে সময় নেয়ার কথা তিন সেকেন্ডে।

ওই অনুষ্ঠানে ‘রেগনাম রিসোর্সেস লি:-এর মালিক মোহাম্মদ হোসেন জনি ছাড়াও ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন ওবায়দুল কাদের, অনুষ্ঠানস্থলে ছিলেন সওজ-এর তত্কালীন প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান, ঢাকা জোনের তত্কালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. সবুজ উদ্দিন খান, নারায়ণগঞ্জ সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ নাজমুল হক, প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী শাহানা ফেরদৌস বিথীসহ সংশ্লিষ্ট অনেকে।

অনুসন্ধানে প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র বলছে, ‘রেগনাম রিসোর্সেস লি:-এর জয়েন্ট স্টকে নিবন্ধিত একটি কোম্পানি বটে। তবে এটি মোহাম্মদ হোসেন জনির মালিকানাধীন একটি বেনামি প্রতিষ্ঠান। রেকর্ডপত্রে কখনো প্রতিষ্ঠানটির ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ দেখানো হয়েছে স্ত্রী শাহনাজ বেগম মিতুকে। কখনো তাকে রাখা হয়েছে রেগনামের ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে। যেখানে শাহনাজ বেগম মিতু এটির ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ সেখানে মোহাম্মদ হোসেন জনির নাম উল্লেখ রয়েছে ‘চেয়ারম্যান’ হিসেবে। আর যেখানে স্ত্রী ‘চেয়ারম্যান’ সেখানে মোহাম্মদ হোসেন জনি নিজেকে দাবি করেছেন ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’। তবে প্রতিটি সংশোধনীতে পুত্র সাদমান সাকিফকে রাখা হয়েছে ‘ডিরেক্টর’ হিসেবে। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে— সর্বত্রই মোহাম্মদ হোসেন জনির টিআইএন নম্বর, ফোন নম্বর, এনআইডি নম্বর গোপন রাখা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নতুন সরকারে আসর পরে নতুন টেন্ডারের মাধ্যমে নাটোর আত্রাই টোল প্লাজায় ইউনিফাইড সিস্টেম সহ টোল আদায়ের দায়িত্ব পেয়েছে মোহাম্মদ হোসেন জনির প্রতিষ্ঠান রেগনাম রিসোর্স লিমিটেড। সরকার পরিবর্তন হলেও মোহাম্মদ হোসেন জনির ডিজিটাল জালিয়াতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার টোল চুরির কোনো পরিবর্তন নেই। কোথায়, কীভাবে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে— সেই খবর সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর ও কর্তা ব্যক্তিদের নেই। 

জানা গেছে, সড়ক ও সেতু দফতরের কতিপয় দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে হাত করে এবং অবৈধ সুবিধা দিয়ে নতুন করে আবারও টোল আদায়ের কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে। প্রক্রিয়াটির সঙ্গে পদস্থ কয়েকজন কর্মকর্তা সম্পৃক্ত থাকায় রেগনামের মতো প্রতিষ্ঠানকে  বারবার টোল আদায়ের দায়িত্ব দেওয়ায় নির্বিঘ্নে শত শত কোটি টাকার টোল চুরির সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে নাটোর সওজের নির্বাহী প্রোকৌশলী মো. কামরুল হাসানে সরকারের সরকারি নম্বরে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন কেটে দিয়ে প্রতিবেদকের নম্বর ব্লক করে দেন। এর পরে নাটোর সওজ উপ বিভাগীয় প্রেকৌশলী মো. ইকবাল হোসেনের সাথে মুঠোফনো যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

বিগত সরকারের ফ্যাসিস্ট হাসিনার সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠজন মোহাম্মদ হোসাইন জনির এই প্রতিষ্ঠানকে এর আগে সীতাকুন্ড (বড় দারোগাহাট), মানিকগঞ্জ (বাথুলি), নেত্রকোনা (জারিয়া), চরসিন্দুর, কুমারখালীর (ফরিদপুর) টোলপ্লাজায় সহ মেঘনা-গোমতী সেতুসহ অনেক সেতুর টোল আদায়ের ‘কার্যাদেশ’ দেয়া হয়। কখনো পাতানো টেন্ডারে, কখনো বিনা টেন্ডারে টোল আদায়ের কার্যাদেশ বাগিয়ে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এজন্য করা হয়নি কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা। ধার ধারতে হয়নি কোনো সরকারি ক্রয়-নীতিমালার (পিপিআর)।

সফটওয়্যারভিত্তিক এই দুর্নীতি ধরা করা কঠিন বলে দীর্ঘদিন ধরে রেগনাম রিসোর্সসহ টোল আদায়ের দ্বায়িত্বে থাকা দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলো এবং সওজের টোল আদায়ের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জালিয়াতি, প্রতারণা ও আত্মসাতের ঘটনা আড়ালে রয়ে যাচ্ছে বারবার। 

এ বিষয়ে জানতে অনিয়মের দায়ে অভিযুক্ত সওজ’র কম্পিউটার সিস্টেম এনালিস্ট আল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো.আহসান হাবিব বলেন, আমাদের কিছু করার থাকে না, এই কোম্পানিগুলো বারবার টেন্ডার পায়। এর আগে কেউ টেন্ডার ড্রপ করেনি। তবে সম্প্রতি কয়েকটা নতুন কোম্পানি অংশগ্রহণ করেছে, কাজও পেয়েছে। ধীরে ধীরে হয়তো এটার কিছুটা পরিবর্তন হবে।

সাবেক সিনিয়র সিস্টেম এনালিস্ট মোছা. সাহেদা মোমতাজ বলেন, আমি এখন অবসরে চলে আসছি। এবিষয়ে আমি কিছু জানি না। তার ব্যক্তিগত সম্পদের তালিকা দিয়ে এর উত্স জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনি সওজের টোল সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন সেটা বলবেন। আমার কোথায় কি আছে সেটা নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমি এখনো ভাড়া বাসায় থাকি। তার চারটি ফ্ল্যাট বাবার বাসা থেকে পেয়েছন এমন প্রশ্নের পরে তিনি ফোন কেটে দেন। এর পরে তার নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

সওজ’র উপ সহকারী প্রকৌশলী মো. বিপুল আক্তার বলেন, সওজের এমআইএস শাখা থেকে লোক নিয়োগ করা হয়েছে। তারা আমাদের এখানে থাকে। কোন সময় সফটওয়্যারের সমস্যা হলে তারা ঠিক করে দেয়, তারা আমাদের ডিপারমেন্টের না। এর আগে রেগনামকে আমাদের এখানে আসতে দেখেছি।