টানা অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং পাহাড়ধসের কারণে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। ইতোমধ্যে সাত জেলার ৫৮টি উপজেলা, ৩৮৬টি ইউনিয়ন এবং ১১টি পৌরসভা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮টি পরিবারের ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ। বন্যায় এখন পর্যন্ত ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন আরও ৩৯ জন। দুর্গত মানুষের জন্য ১ হাজার ১৩১টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সর্বশেষ পরিস্থিতি প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। একই দিনে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় দেশের আরও ১৬ জেলার নিম্নাঞ্চলে নতুন করে বন্যা দেখা দিতে পারে অথবা বিদ্যমান পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে: বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলা। চট্টগ্রামে প্রায় ৫ লাখ ৯৫ হাজার মানুষ বন্যার প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পানিবন্দি রয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ পরিবার। জেলায় ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১২ জন। বর্তমানে ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ২২ হাজার মানুষ অবস্থান করছেন। বহু গ্রামীণ সড়ক, সেতু ও ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় অনেক এলাকায় এখনও ত্রাণ পৌঁছাতে বিলম্ব হচ্ছে।
এদিকে কক্সবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৭। পানিবন্দি হয়েছে ৩৯ হাজার ৫০৬টি পরিবার। স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গাসহ ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ২৪ জন এবং একজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। জেলার ২৭টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ৫৮০ জন আশ্রয় নিয়েছেন। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ধসের কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া বান্দরবানে ছয়জন, রাঙ্গামাটিতে তিনজন এবং মৌলভীবাজারে একজনের মৃত্যু হয়েছে। খাগড়াছড়িতে একজন আহত হয়েছেন। পাহাড়ি জেলা তিনটিতে বহু সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বিভিন্ন এলাকা।
আশ্রয়কেন্দ্রে অনিশ্চয়তার জীবন: দুর্গত মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে নিরাপদ আশ্রয় পেলেও সেখানে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন এবং চিকিত্সাসেবার চাহিদা বাড়ছে। শিশু, নারী, প্রবীণ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি, গবাদিপশু, ফসল এবং জীবিকার প্রধান উত্স হারিয়ে ভবিষ্যত্ নিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। নিম্নাঞ্চলের বহু এলাকায় এখনও ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে রয়েছে। কোথাও কোমর সমান, কোথাও বুকসমান পানি জমে থাকায় মানুষ নৌকা ছাড়া চলাচল করতে পারছে না। বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় দুর্গতদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে চাল, নগদ অর্থ, শুকনা খাবার, রান্না করা খাবার এবং ঢেউটিনসহ বিভিন্ন ধরনের ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। গত ৭ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত সাতটি ক্ষতিগ্রস্ত জেলার জন্য ২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশের ৬৪ জেলার জন্য মানবিক সহায়তা হিসেবে ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং ৮ হাজার ৯৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বিভিন্ন মানবিক সংস্থার সমন্বয়ে উদ্ধার, আশ্রয় ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পরিস্থিতির প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ত্রাণ বরাদ্দ দেয়া হবে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
পাঁচ নদীর পানি এখনও বিপৎসীমার ওপরে: বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে নদ-নদীর পানি এখনও বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বান্দরবান ও চট্টগ্রামের দোহাজারী পয়েন্টে সাঙ্গু নদী, সুনামগঞ্জের মারকুলি ও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে কুশিয়ারা নদী এবং নেত্রকোণার কলমাকান্দা পয়েন্টে সোমেশ্বরী নদী।
এই নদীগুলোর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে প্লাবনের আশঙ্কা রয়েছে। আরও ১৬ জেলায় বন্যার সতর্কবার্তা: সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, আগামী দুই দিনের মধ্যে ফেনী, চট্টগ্রাম ও খাগড়াছড়ির নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর নিম্নাঞ্চলের কিছু এলাকা সাময়িকভাবে প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার নিম্নাঞ্চলে চলমান বন্যা পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে অথবা নতুন এলাকা প্লাবিত হতে পারে।
এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলের নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলেও স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, অতিভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে নতুন নতুন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যমান বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।
কিছু এলাকায় উন্নতির আভাস: তবে সবখানেই পরিস্থিতি একই রকম নয়। পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী ২৪ ঘণ্টায় বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি কমতে পারে। একই সঙ্গে মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের মনু, ধলাই ও খোয়াই নদীর পানিও হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে এসব নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির আংশিক উন্নতি হতে পারে।




Comments