Image description

বিমানবন্দর রেলস্টেশনে একজন যাত্রী বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই ব্যবহার করছেন। কয়েক মাস বা কয়েক বছরের মধ্যে একই নাগরিক হয়তো একটি সমন্বিত ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমে চিকিৎসা, শিক্ষা, কর, ব্যাংকিং ও সামাজিক নিরাপত্তার সেবা নেবেন।
প্রথমটি নাগরিক সুবিধা। দ্বিতীয়টি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নতুন অবকাঠামো।


এই দুই দৃশ্যের মধ্যকার দূরত্বেই বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি নিহিত। সরকার কত দ্রুত নতুন প্রযুক্তি চালু করতে পারে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই প্রযুক্তি কে নিয়ন্ত্রণ করবে, নাগরিকের তথ্য কোন উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে এবং ভুল, বৈষম্য বা অপব্যবহার হলে জবাবদিহি করবে কে?


সেদিকটায় নজর না থাকলেও ৫জি, ফাইবার ব্যাংক, একক ডিজিটাল পরিচয়, এআই নীতি ও ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল সামনে এনেছে নতুন সরকার। সরকারের লক্ষ্য ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে ৫জি এবং দেশজুড়ে ১০০ এমবিপিএস ব্রডব্যান্ড পৌঁছে দেওয়া। পাশাপাশি ডিজিটাল নাগরিক ব্যবস্থাপানায় ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ প্রতিষ্ঠা। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত তথ্যভান্ডার নতুন নিরাপত্তা ও নজরদারির ঝুঁকিও তৈরি করবে। মোটের ওপর বাংলাদেশের পরবর্তী ডিজিটাল অভিযাত্রার অভিন্ন নাম, বাস্তবায়ন কাঠামো ও জবাবদিহির মানদণ্ড এখনো স্পষ্ট নয়।

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়। ডাক,  টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ফকির মাহবুব আনামের হাতে অর্পণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে ভোটে জয়ী এই নেতাকে সহযোগিতার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয় খাত সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ রেহান আসিফ আসাদ-কে।  এর মধ্য দিয়ে প্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ, বিজ্ঞান, গবেষণা ও ডিজিটাল অর্থনীতিকে সমন্বিতভাবে পরিচালনার একটি রাজনৈতিক অভিপ্রায় প্রকাশ পেয়েছে।
সিদ্ধান্তটি যৌক্তিক। এক্ষেত্রে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, সমন্বিত দায়িত্বের সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা; অর্থাৎ সরকারের অপরাপর বিভিন্ন দপ্তর, সংস্থা ও বিভাগ যদি একক লক্ষেই বিচ্ছিন্ন ভাবে কাজ না করে তবে তা বুমেরাং হতে পারে। 

গত দুই দশকে বাংলাদেশ অসংখ্য ডিজিটাল প্রকল্প, ডেটা সেন্টার, সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ও যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। কিন্তু প্রকল্পের সঙ্গে কার্যকর প্রতিষ্ঠান, উদ্বোধনের সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ এবং ব্যয়ের সঙ্গে পরিমাপযোগ্য ফলাফলের সম্পর্ক সব সময় স্পষ্ট ছিল না।
অনেক উদ্যোগ নতুন নাম পেয়েছে, কিন্তু পুরোনো সমস্যাগুলো থেকে গেছে: দুর্বল সমন্বয়, অস্পষ্ট কর্তৃত্ব, নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা, ব্যয়বৃদ্ধি, প্রকল্পনির্ভরতা এবং সীমিত জনজবাবদিহি।
তাই নতুন সরকারের প্রথম পাঁচ মাসকে শুধু ঘোষিত প্রকল্প, তহবিল বা লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। প্রকৃত প্রশ্ন হলো, সরকার কি নতুন কিছু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রকল্প চালু করছে, নাকি ডিজিটাল রাষ্ট্র পরিচালনার আইনগত, প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক ভিত্তি নির্মাণ করছে?


নতুন সরকারের ডিজিটাল এজেন্ডার নাম কী?


বাংলাদেশের ডিজিটাল উন্নয়নের ভাষা সময়ের সঙ্গে বদলেছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আইটিকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিস্তৃত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বা আইসিটি এজেন্ডার দিকে অগ্রসর হওয়ার উদ্যোগ দেখা যায়। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় ডিজিটাল কার্যক্রম ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ রূপকল্পের অধীনে পরিচালিত হয়েছে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আলোচনায় আসে ‘ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন’ বা ডিজিটাল রূপান্তর এবং ‘সিটিজেন ফেজ অব ইন্টারঅপারেবিলিটি’ বা সংযুক্ত সেবা। প্রতিটি পর্বের রাজনৈতিক ভাষা, উন্নয়ন দর্শন ও বাস্তবায়ন অগ্রাধিকার আলাদা ছিল। বিশেষ করে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ কার্যত রাজনৈতিক স্লোগান হলেও এটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে একটি অভিন্ন ভাষা দিয়েছিল।


বর্তমান সরকারের বাজেট বক্তৃতায় ‘ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশন অ্যান্ড আইসিটি ডেভেলপমেন্ট’কে কৌশলগত অগ্রাধিকারের একটি ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতীয় এআই নীতির সরকারি প্ল্যাটফর্মে আবার ‘এমপাওয়ারিং বাংলাদেশ ২.০’ ভাষাটি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে এগুলোর কোনোটিই এখন পর্যন্ত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর মতো একটি সুস্পষ্ট, অভিন্ন ও সর্বজনস্বীকৃত জাতীয় ডিজিটাল পরিচিতিতে রূপ নেয়নি। এটি প্রকাশ্য সরকারি নথির ভাষা থেকে পাওয়া একটি পর্যবেক্ষণ।
এখানেই ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি মৌলিক নীতিগত প্রশ্ন রয়েছে: বাংলাদেশের পরবর্তী ডিজিটাল অভিযাত্রার নাম কী?
নামটি কেবল প্রচারের জন্য নয়। একটি অভিন্ন রাষ্ট্রীয় রূপকল্প থাকলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী, নাগরিক সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি খাত নিজেদের কর্মসূচি একই লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে।


কিন্তু শুধু নতুন ট্যাগলাইন নির্ধারণ করলেই হবে না। এর সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গি, অগ্রাধিকার, প্রতিষ্ঠান, বাজেট, সময়সীমা এবং পরিমাপযোগ্য ফলাফলের কাঠামো থাকতে হবে।
বাংলাদেশের এখন নতুন স্লোগানের চেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি সুসংহত ডিজিটাল উন্নয়ন দর্শন।


বাজেটে বড় লক্ষ্য, পরিমাপের সূচক কোথায়?


২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কয়েকটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ডিজিটাল লক্ষ্য সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে: ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’; জাতীয় ফাইবার ব্যাংক; ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর কাছে ৫জি পৌঁছে দেওয়া; দেশজুড়ে ১০০ এমবিপিএস ব্রডব্যান্ড; রেলস্টেশন ও বিমানবন্দরে বিনামূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট; কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সরকারি সেবা; নারী, তরুণ ও নতুন তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল।
এসব পরিকল্পনা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে শুধু সহায়ক খাত হিসেবে নয়, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, জনসেবা ও প্রশাসনিক আধুনিকায়নের চালিকাশক্তি হিসেবে দেখার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু লক্ষ্য যত বড়, পরিমাপের দায়ও তত বড়।


৯০ শতাংশ ৫জি কভারেজ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? এটি জনসংখ্যার কভারেজ, নাকি ভৌগোলিক কভারেজ? কোনো এলাকায় ৫জি সংকেত দেখা গেলেই কি লক্ষ্য অর্জিত হবে, নাকি সাশ্রয়ী ডিভাইস, নির্ভরযোগ্য গতি, সেবার মূল্য ও অর্থবহ ব্যবহারও পরিমাপ করা হবে?
একইভাবে ১০০ এমবিপিএস ব্রডব্যান্ড বলতে কি বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা সর্বোচ্চ গতি বোঝাবে, নাকি একজন গ্রাহক দিনের ব্যস্ত সময়েও নিয়মিত যে গতি পাবেন, সেটি হবে পরিমাপের ভিত্তি? স্পষ্ট সংজ্ঞা, সময়সীমা ও প্রকাশ্য অগ্রগতি প্রতিবেদন ছাড়া বড় লক্ষ্য সহজেই বড় স্লোগানে পরিণত হতে পারে।


স্টার্টআপ তহবিল: টাকার চেয়ে পরিচালন নকশা গুরুত্বপূর্ণ


৫০০ কোটি টাকার স্টার্টআপ তহবিল সরকারের একটি সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ। তবে এটিকে শুধু ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিশেষ তহবিল হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বাজেট বক্তৃতা অনুযায়ী, এটি নারী, তরুণ ও নতুন তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের সহায়তার একটি বৃহত্তর উদ্যোগ।
তহবিলের আকারের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে এর পরিচালন কাঠামো।
অর্থ কারা পাবেন? সিদ্ধান্ত নেবেন কারা? ব্যক্তিগত পরিচিতি, রাজনৈতিক যোগাযোগ বা প্রশাসনিক প্রভাবের বদলে উদ্ভাবন, বাজার সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক প্রভাব কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে?
ঢাকার বাইরের উদ্যোক্তা, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও স্বল্প আয়ের তরুণদের জন্য কি আলাদা প্রবেশপথ থাকবে? উদ্যোগ ব্যর্থ হলে সেটিকে উদ্ভাবনের স্বাভাবিক ঝুঁকি হিসেবে দেখা হবে, নাকি উদ্যোক্তাকে শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে? আবার ব্যর্থতার অজুহাতে দায়িত্বহীন ব্যয় ও স্বজনপ্রীতি ঠেকাতে কী ধরনের নিরীক্ষা থাকবে?
বাংলাদেশের ডিজিটাল শ্রমবাজারও দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ডেটা এন্ট্রি, সাধারণ অনুবাদ, মৌলিক কনটেন্ট উৎপাদন ও গ্রাহকসেবার অনেক কাজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে আংশিক বা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় হচ্ছে।
তাই স্বল্পমূল্যের শ্রমের ওপর দাঁড়ানো ফ্রিল্যান্সিং মডেল দীর্ঘমেয়াদে যথেষ্ট হবে না।
নতুন তহবিলকে উন্নত সফটওয়্যার, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা বিশ্লেষণ, চিপ ডিজাইন, বাংলা ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তি, ডিজিটাল জনপরিকাঠামো, কৃষিপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি ও জলবায়ু সহনশীল উদ্ভাবনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

শুধু অর্থ বিতরণ করলে তহবিল একসময় শেষ হবে। দক্ষতা, গবেষণা, মেন্টরশিপ, বাজারে প্রবেশ, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট এবং উদ্যোক্তার সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এটি অর্থনীতির কাঠামো বদলাতে পারে।


গবেষণা ও উদ্ভাবন: আমদানিনির্ভরতা কমবে কীভাবে?


বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু বিদেশি সফটওয়্যার, ক্লাউড সেবা বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। স্থানীয় গবেষণা, প্রকৌশল সক্ষমতা, বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প সহযোগিতা এবং নিজস্ব মেধাসম্পদ তৈরির প্রয়োজন রয়েছে।
গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানোর ঘোষণা ইতিবাচক। তবে গবেষণার বাজেট বাড়ালেই গবেষণার মান বাড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
অনুদান বণ্টনের জন্য স্বাধীন ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যায়ন দরকার। কোন গবেষণা অর্থ পেল, কেন পেল, কারা মূল্যায়ন করলেন এবং এর ফলাফল কী হলো, তা প্রকাশ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের গবেষণা অগ্রাধিকার বড় ভবন বা ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। বাংলা ও আঞ্চলিক ভাষা প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা, কৃষি, জনস্বাস্থ্য, জলবায়ু, দুর্যোগ পূর্বাভাস, নদী ও উপকূল এবং স্থানীয় শিল্পের বাস্তব সমস্যাকে গবেষণার কেন্দ্রে আনতে হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রকৌশল সক্ষমতার একটি বড় পরীক্ষা। তবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি মূল্যায়নে স্থানীয় ডিজিটাল গবেষণা, সাইবার সক্ষমতা, ভাষা প্রযুক্তি এবং গবেষণা থেকে বাজারে যাওয়ার পথ আরও প্রত্যক্ষ সূচক।
প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের অর্থ সবকিছু দেশে তৈরি করা নয়। এর অর্থ হলো, কোন প্রযুক্তির ওপর রাষ্ট্র কতটা নির্ভরশীল, কোন তথ্য বিদেশে যাচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ নিজে তা পরিচালনা বা পুনরুদ্ধার করতে পারবে কি না, সেই সক্ষমতা গড়ে তোলা।


জাতীয় এআই নীতি: উদ্ভাবনের দলিল, নাকি ক্ষমতার সীমারেখা?


জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি ২০২৬-২০৩০-এর দ্বিতীয় খসড়া জনপরামর্শের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে। এতে মানবকেন্দ্রিক এআই, ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব, বাংলা ভাষা, তথ্য সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা এবং তদারকি কাঠামোর কথা বলা হয়েছে।
এগুলো প্রয়োজনীয় অঙ্গীকার। কিন্তু দায়িত্বশীল এআই নীতির সবচেয়ে কঠিন অংশ উদ্ভাবনের প্রতিশ্রুতি নয়, ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ।

কোন সরকারি সংস্থা নাগরিকের তথ্য ব্যবহার করে এআই ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে? কোনো অ্যালগরিদমের কারণে একজন মানুষ ঋণ, চাকরি, চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা বা সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হলে তিনি কোথায় আপিল করবেন?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা মুখ শনাক্তকরণ, স্বয়ংক্রিয় নজরদারি বা পূর্বাভাসভিত্তিক পুলিশিং ব্যবহার করলে তার আইনগত সীমা কী হবে? বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানি বাংলাদেশে ক্ষতিকর, বৈষম্যমূলক বা অস্বচ্ছ এআই ব্যবস্থা চালু করলে তাদের স্থানীয়ভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে কীভাবে?
বাংলাদেশের মতো ভাষা ও সামাজিক বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশে প্রতিনিধিত্বও একটি বড় প্রশ্ন। বাংলা ভাষা, আঞ্চলিক উপভাষা, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঠিক প্রতিনিধিত্ব না থাকলে এআই ব্যবস্থা পক্ষপাতপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিতে পারে।
কোনো তদারকি প্রতিষ্ঠানের নামের সঙ্গে ‘স্বাধীন’ শব্দ যোগ করলেই সেটি স্বাধীন হয় না। সদস্য নিয়োগ, বাজেট, তদন্তের ক্ষমতা, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নথি চাওয়ার অধিকার এবং সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার সক্ষমতা দিয়েই স্বাধীনতা বিচার করতে হবে।
জাতীয় এআই নীতি শুধু প্রযুক্তি উন্নয়নের রোডম্যাপ নয়। এটি রাষ্ট্র, নাগরিক ও প্রযুক্তি কোম্পানির মধ্যে ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের একটি সামাজিক চুক্তি।


এক নাগরিক, এক পরিচয়: সেবার সঙ্গে ঝুঁকিও কেন্দ্রীভূত হবে 


‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ সরকারি ও বেসরকারি সেবা সহজ করতে পারে। একই তথ্য বারবার জমা দেওয়ার প্রয়োজন কমবে। পরিচয় যাচাই দ্রুত হবে। ভাতা, ফি ও অন্যান্য লেনদেন একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় আনা সম্ভব হবে।
কিন্তু প্রযুক্তিগত সুবিধা রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বাতিল করে না।
স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর, ব্যাংকিং, ভ্রমণ, সামাজিক নিরাপত্তা ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য যদি একটি সমন্বিত ব্যবস্থায় যুক্ত হয়, তবে সেটি শুধু সেবা দেওয়ার প্ল্যাটফর্ম থাকবে না। এটি নাগরিকের জীবনের একটি বিস্তৃত তথ্যচিত্র তৈরি করবে।
বাংলাদেশে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি হয়েছে। এখন প্রশ্ন শুধু আইন আছে কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, আইনটির প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কতটা স্বাধীন হবে, রাষ্ট্রীয় সংস্থার তথ্য ব্যবহারের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ থাকবে কি না এবং ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিক বাস্তবে প্রতিকার পাবেন কি না।
একক পরিচয়ব্যবস্থায় তাই শুরুতেই কয়েকটি সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
প্রতিটি সংস্থা শুধু তার দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য দেখতে পারবে। নাগরিকের সব তথ্য একটি সহজে ব্যবহারযোগ্য কেন্দ্রীয় প্রোফাইলে উন্মুক্ত রাখা যাবে না। কে কখন কোন তথ্য দেখেছে, তার নিরীক্ষাযোগ্য রেকর্ড থাকতে হবে।
তথ্য ফাঁস হলে দ্রুত নাগরিককে জানাতে হবে। ভুল তথ্য সংশোধন, বেআইনি ব্যবহার বন্ধ এবং ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কার্যকর সুযোগ থাকতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ডিজিটাল পরিচয় যেন কাউকে সরকারি সেবা থেকে বাদ দেওয়ার নতুন যন্ত্র না হয়। আঙুলের ছাপ না মেলা, ইন্টারনেট না থাকা, ফোন হারিয়ে যাওয়া বা ডেটাবেসে ভুল থাকার কারণে খাদ্য, চিকিৎসা বা সামাজিক নিরাপত্তা বন্ধ হতে পারে না।
ডিজিটাল পরিচয়ের সাফল্য কত কোটি মানুষ নিবন্ধন করেছেন, তা দিয়ে নয়; ভুল হলে কত দ্রুত সংশোধন করতে পেরেছেন, সেটি দিয়ে পরিমাপ করা উচিত।


তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ: শ্বেতপত্রের পর সংস্কার কোথায়?


তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি সফটওয়্যার নয়, সংযোগ। নির্ভরযোগ্য মোবাইল নেটওয়ার্ক, সাশ্রয়ী ডেটা, ফাইবার অবকাঠামো এবং কার্যকর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ছাড়া এআই, ডিজিটাল পরিচয় বা অনলাইন জনসেবার কোনো উদ্যোগ টেকসই হবে না।
টেলিযোগাযোগ খাতের অনিয়ম, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও কাঠামোগত সমস্যা নিয়ে শ্বেতপত্র ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি প্রকাশ করা হয়েছে। নতুন সরকারের কাজ আরেকটি শ্বেতপত্রের প্রতিশ্রুতি দেওয়া নয়। কাজ হলো প্রকাশিত অনুসন্ধানের ভিত্তিতে সময়সীমাবদ্ধ সংস্কার কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা।
এখানে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের স্বাধীনতা কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
স্পেকট্রাম, লাইসেন্স, ইন্টারকানেকশন, প্রতিযোগিতা, সেবার মান ও ভোক্তা অধিকার নিয়ে বিটিআরসির প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব রয়েছে।
সিদ্ধান্তের ভিত্তি, ব্যবহৃত তথ্য এবং প্রত্যাশিত ফল প্রকাশ না করলে নিয়ন্ত্রণ ও নীতিনির্ধারণের সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়।
নিয়ন্ত্রকের স্বাধীনতা মানে শুধু সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ না থাকা নয়। শিল্পখাতের অযৌক্তিক প্রভাব থেকেও তাকে মুক্ত থাকতে হবে। একই সঙ্গে তার সিদ্ধান্ত আদালত, সংসদ ও জনগণের কাছে পর্যালোচনাযোগ্য হতে হবে।


৭০০ মেগাহার্টজ: রাজস্বের আগে সংযোগ


৭০০ মেগাহার্টজের মতো কভারেজ ব্যান্ডের মূল্য নির্ধারণের সময় শুধু নিলাম থেকে কত রাজস্ব পাওয়া যাবে, তা দেখলে চলবে না। অত্যধিক মূল্য অপারেটরদের নেটওয়ার্কে বিনিয়োগের সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
স্পেকট্রাম একটি সীমিত জাতীয় সম্পদ। কিন্তু এর সর্বোচ্চ মূল্য শুধু নিলামে পাওয়া অর্থে নির্ধারিত হয় না।
চর, পাহাড়, উপকূল ও প্রত্যন্ত গ্রামে কত মানুষ নির্ভরযোগ্য সংযোগ পেলেন এবং সেই সংযোগ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা ও জনসেবায় কী পরিবর্তন আনল, সেটিই প্রকৃত মূল্য।
স্বল্পমেয়াদি রাজস্বের জন্য স্পেকট্রামের দাম অত্যধিক নির্ধারণ করা হলে দীর্ঘমেয়াদে ডিজিটাল অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

৫জি: তালিকায় নাম নয়, অর্থবহ ব্যবহার দরকার


বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৫জির অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হয়েছে শিল্পকারখানা, বন্দর, স্বাস্থ্যসেবা, লজিস্টিকস, কৃষি, পরিবহন ও ইন্টারনেট অব থিংসের ব্যবহারে।
শুধু কয়েকটি শহরে দ্রুতগতির মোবাইল ইন্টারনেট চালু করে আন্তর্জাতিক তালিকায় নাম তোলাকে অর্থবহ সাফল্য বলা যাবে না।
বাংলাদেশের ৫জি সম্প্রসারণের আগে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
বিদ্যমান ৪জি সেবার মান কতটা নির্ভরযোগ্য? কল ড্রপ, দুর্বল কভারেজ ও গতির অসামঞ্জস্য কতটা কমেছে? শিল্পখাত ও সরকারি সেবায় ৫জির ব্যবহার কোথায় হবে? সাশ্রয়ী ডিভাইস ছাড়া সাধারণ মানুষ এই সুবিধা নেবেন কীভাবে?
অসম্পূর্ণ ৪জির ওপর ব্যয়বহুল ৫জির স্তর বসানো প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়। সেটি নীতিগত অগ্রাধিকারের বিভ্রান্তি।
ইন্টারনেটের গতি নয়, ক্রয়ক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ
ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির আলোচনায় একটি মৌলিক বিষয় প্রায়ই আড়ালে পড়ে যায়: ইন্টারনেটের মূল্য।
গতি বাড়লেও সাধারণ মানুষ তা বহন করতে না পারলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সামাজিক অগ্রগতিতে রূপ নেয় না।
স্মার্টফোন, ডেটা প্যাকেজ, ব্রডব্যান্ড সংযোগ, রাউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের মোট ব্যয় একজন নাগরিকের ডিজিটাল অংশগ্রহণের সক্ষমতা নির্ধারণ করে।
একদিকে সরকার সাশ্রয়ী ইন্টারনেটের কথা বলছে। অন্যদিকে ইন্টারনেট সেবাদাতা ও অবকাঠামো উদ্যোক্তাদের ওপর কর, ফি, লাইসেন্সিং ব্যয় ও প্রশাসনিক জটিলতা বহাল থাকলে সেই ব্যয় শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের ওপরই বর্তাবে।
তাই সাশ্রয়ী ইন্টারনেটের নীতি শুধু খুচরা মূল্য কমানোর নির্দেশ হতে পারে না। পুরো মূল্যশৃঙ্খলে প্রতিযোগিতা, কর, অবকাঠামো ভাগাভাগি, স্থানীয় উদ্যোক্তার সক্ষমতা এবং গ্রাহক অধিকারকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।


বৈশ্বিক প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের নীতি কোথায়?


বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নীতি এখন আর শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আন্তসীমান্ত ডেটা, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও ইন্টারনেট শাসন আন্তর্জাতিক নিয়ম, প্রযুক্তিগত মান এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত।
এই বৈশ্বিক কাঠামোর অন্তত পাঁচটি প্রক্রিয়া বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ:
ওয়ার্ল্ড সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি বা ডব্লিউএসআইএস; ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরাম বা আইজিএফ;
প্যাক্ট ফর দ্য ফিউচার ও গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্ট;জাতিসংঘের গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স;
আইটিইউর এআই ফর গুড।
এগুলো একই ধরনের সম্মেলন নয়। এগুলোর রাজনৈতিক কর্তৃত্ব, অংশগ্রহণের ধরন ও প্রত্যাশিত ফল আলাদা। বাংলাদেশের ভুল হবে এগুলোকে কিছু বিদেশ সফর, বক্তৃতা ও সম্মেলনের তালিকা হিসেবে দেখা।


ডব্লিউএসআইএস: ঘোষণার পর এখন বাস্তবায়ন


ওয়ার্ল্ড সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটির প্রথম পর্ব ২০০৩ সালে জেনেভায় এবং দ্বিতীয় পর্ব ২০০৫ সালে তিউনিসে অনুষ্ঠিত হয়। এর লক্ষ্য ছিল মানুষকেন্দ্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্নয়নমুখী তথ্যসমাজ গড়ে তোলা।
ডব্লিউএসআইএসের ১১টি অ্যাকশন লাইন জননীতি, তথ্য ও যোগাযোগ অবকাঠামো, তথ্য ও জ্ঞানে প্রবেশাধিকার, সক্ষমতা বৃদ্ধি, সাইবার নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, গণমাধ্যম, নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে একই কাঠামোর মধ্যে এনেছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর ডব্লিউএসআইএস+২০ ফলাফল দলিল গ্রহণ করে। এর পর ২০২৬ সালের ডব্লিউএসআইএস ফোরাম ছিল প্রথম বার্ষিক ফোরাম, যার প্রধান চ্যালেঞ্জ নতুন ঘোষণা নয়, বাস্তবায়ন রোডম্যাপ তৈরি করা।
বাংলাদেশে এআই নীতি, ফাইবার, ডিজিটাল পরিচয়, সাইবার নিরাপত্তা ও ই-গভর্নমেন্ট নিয়ে আলাদা উদ্যোগ আছে। কিন্তু এসব উদ্যোগকে ডব্লিউএসআইএসের ১১টি অ্যাকশন লাইনের সঙ্গে মিলিয়ে একটি প্রকাশ্য জাতীয় বাস্তবায়ন মানচিত্রে রূপ দেওয়া হয়নি।
ফলে সরকার জানে কোন প্রকল্পে কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু নাগরিক সহজে জানতে পারেন না কোন আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হচ্ছে, কারা উপকৃত হচ্ছেন এবং কারা পেছনে পড়ে থাকছেন।


আইজিএফ: উপস্থিতি নয়, প্রভাবের সুযোগ


ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামে সরকার, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ, প্রযুক্তি সম্প্রদায়, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম ও তরুণেরা তুলনামূলক সমতার ভিত্তিতে ইন্টারনেট-সংক্রান্ত জননীতি নিয়ে আলোচনা করেন।
আইজিএফ কোনো বাধ্যতামূলক চুক্তি প্রণয়নের মঞ্চ নয়। এর শক্তি হলো উদীয়মান সমস্যা শনাক্ত করা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং নীতিনির্ধারণকে প্রভাবিত করা।
বাংলাদেশের জাতীয় আইজিএফ যদি শুধু একটি বার্ষিক অনুষ্ঠান হয়, তবে তার মূল্য সীমিত থাকবে।
জাতীয় আইজিএফের সুপারিশ বিটিআরসি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংসদীয় কমিটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা প্রয়োজন। সরকারকে জানাতে হবে কোন সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে, কোনটি হয়নি এবং কেন হয়নি।
বহুপক্ষীয় অংশগ্রহণ মানে সবাইকে একই সভায় আমন্ত্রণ জানানো নয়। এর অর্থ হলো সিদ্ধান্তকে বাস্তবে প্রভাবিত করার সুযোগ দেওয়া।


গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্ট: অঙ্গীকারের জাতীয় অনুবাদ প্রয়োজন


জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ২০২৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর প্যাক্ট ফর দ্য ফিউচার গ্রহণ করে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্ট। এতে ডিজিটাল বৈষম্য, মানবাধিকার, নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ, ডেটা শাসন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে একটি বৈশ্বিক রাজনৈতিক কাঠামো দেওয়া হয়েছে।
এই কমপ্যাক্ট কোনো বৈশ্বিক সরকার নয় এবং এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের ওপর নতুন আইন আরোপ করে না।
তবে বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারে সম্মতি দিয়েছে, তার প্রতিফলন জাতীয় নীতিতে থাকা উচিত।
প্রতিটি বড় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রকল্পের আগে তাই অধিকার, নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তির প্রভাব মূল্যায়ন প্রয়োজন।
প্রকল্পটি ডিজিটাল বৈষম্য কমাবে, নাকি বাড়াবে? নাগরিকের স্বাধীনতা রক্ষা করবে, নাকি নজরদারির ক্ষমতা বাড়াবে? নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের ওপর এর আলাদা প্রভাব কী হবে?
উন্নয়ন ও অধিকারের প্রশ্নকে বিচ্ছিন্ন রাখলে গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্টের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে।

গ্লোবাল ডায়ালগ ও এআই ফর গুড এক নয়


জাতিসংঘের প্রথম গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স ২০২৬ সালের ৬ ও ৭ জুলাই জেনেভায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ প্রতিষ্ঠিত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ। তবে এটি নিয়ন্ত্রক বা আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নয়।
অন্যদিকে এআই ফর গুড আইটিইউ পরিচালিত প্রয়োগ, দক্ষতা, মান ও অংশীদারত্বকেন্দ্রিক প্ল্যাটফর্ম। এটি ৫০টির বেশি জাতিসংঘ সংস্থা ও অংশীদারের সহযোগিতায় পরিচালিত হলেও কোনো আন্তসরকারি চুক্তি প্রণয়নকারী সংস্থা নয়।
বাংলাদেশকে এই পার্থক্য বুঝে অংশ নিতে হবে।
গ্লোবাল ডায়ালগে বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত নীতি, সম্পদ ও ক্ষমতার প্রশ্ন তোলা: কার ভাষা এআই বুঝবে, কার তথ্য ব্যবহার করা হবে, কম্পিউটিং অবকাঠামো কে পাবে, অর্থনৈতিক লাভ কার কাছে যাবে এবং ক্ষতির দায় কে বহন করবে?
এআই ফর গুডে বাংলাদেশের উচিত দেশের বাস্তব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়ে যাওয়া: বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের আগাম সতর্কতা, বাংলা ও আঞ্চলিক ভাষার জনসেবা, কৃষি, কমিউনিটি স্বাস্থ্য, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সহায়ক প্রযুক্তি এবং প্রযুক্তিসহায়ক জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ।

একটিতে বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যটিতে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষিত সমাধান ও কার্যকর অংশীদারত্ব।


ওয়াইকো: উপস্থিতি আছে, অবস্থান কোথায়?


২০২৬ সালের ১৬ জুলাই সাংহাইয়ে ২৯টি দেশ ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা ওয়াইকো প্রতিষ্ঠার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। এটি সাংহাইভিত্তিক একটি স্বাধীন আন্তসরকারি আন্তর্জাতিক সংস্থা।
বাংলাদেশের প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রী ওয়ার্ল্ড আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কনফারেন্সে অংশ নিয়েছেন। তবে বাংলাদেশ ওয়াইকোর প্রতিষ্ঠা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে কি না এবং নতুন সংস্থাটি সম্পর্কে সরকারের অবস্থান কী, সে বিষয়ে প্রকাশ্য ব্যাখ্যা স্পষ্ট নয়।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য না হয়ে থাকলে সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কূটনৈতিক ব্যর্থতা বলা ঠিক হবে না। একটি নতুন আন্তসরকারি সংস্থায় যোগ দেওয়ার আগে আইনি বাধ্যবাধকতা, অর্থায়ন, ভোটাধিকার, ডেটা সার্বভৌমত্ব, প্রযুক্তি প্রবেশাধিকার এবং জাতীয় স্বার্থ যাচাই করা প্রয়োজন।
কিন্তু নীরবতাও যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশ কি চুক্তিতে স্বাক্ষরের আমন্ত্রণ পেয়েছিল? পেয়ে থাকলে কী বিবেচনায় স্বাক্ষর করেনি? ভবিষ্যতে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা আছে কি? জাতিসংঘের গ্লোবাল ডায়ালগ, ডব্লিউএসআইএস এবং ওয়াইকোর মতো নতুন কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশ কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করবে?
এআই কূটনীতি এখন আর সম্মেলনে উপস্থিত থাকা বা বক্তৃতা দেওয়ার বিষয় নয়। এটি আন্তর্জাতিক নিয়ম তৈরির টেবিলে প্রস্তুত অবস্থায় আসন নেওয়ার প্রশ্ন।


এখন যা জরুরি
প্রথম পাঁচ মাসের ঘোষণাগুলোকে একটি সুসংহত জাতীয় কর্মসূচিতে রূপ দিতে সাতটি পদক্ষেপ প্রয়োজন।


ডিজিটাল অভিযাত্রার অভিন্ন রূপকল্প নির্ধারণ


অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে বাংলাদেশের পরবর্তী ডিজিটাল উন্নয়ন পর্যায়ের একটি সামগ্রিক নাম, রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বাস্তবায়ন দর্শন নির্ধারণ করতে হবে। তবে নামের সঙ্গে বাজেট, সূচক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব যুক্ত না থাকলে তা শুধু প্রচারসর্বস্ব স্লোগান হবে।


জাতীয় ডিজিটাল সহযোগিতা ও এআই কূটনীতি রোডম্যাপ

ডব্লিউএসআইএসের ১১টি অ্যাকশন লাইন, গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্ট, আইজিএফ, গ্লোবাল ডায়ালগ, এআই ফর গুড ও ওয়াইকোর সঙ্গে বাংলাদেশের লক্ষ্য, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এবং সময়সীমা প্রকাশ করতে হবে।


স্থায়ী বহুপক্ষীয় সমন্বয়ব্যবস্থা


সরকার ও শিল্পখাতের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, কমিউনিটি মিডিয়া, বিশ্ববিদ্যালয়, নারী, যুব, শ্রমিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
ডিজিটাল পরিচয়ের অধিকার ও নিরাপত্তা কাঠামো
কোন তথ্য যুক্ত হবে, কে ব্যবহার করবে, কোন তথ্য একত্র করা যাবে না, নাগরিক কীভাবে আপত্তি জানাবেন এবং তথ্য ফাঁস হলে কী প্রতিকার পাবেন, তা বাস্তবায়নের আগেই নির্ধারণ করতে হবে।


টেলিযোগাযোগ সংস্কারের প্রকাশ্য স্কোরকার্ড


স্পেকট্রাম, লাইসেন্সিং, সেবার মান, কল ড্রপ, ব্রডব্যান্ডের মূল্য, গ্রামীণ কভারেজ ও ভোক্তা অভিযোগের অগ্রগতি প্রতি তিন মাসে প্রকাশ করা উচিত।


এআই তদারকিতে প্রকৃত স্বাধীনতা


সরকারের ভেতরে একটি কমিটি গঠন করে তাকে স্বাধীন বলা যথেষ্ট নয়। নিয়োগ, বাজেট, তদন্ত, প্রযুক্তিগত নিরীক্ষা এবং সিদ্ধান্ত প্রকাশের নিশ্চয়তা প্রয়োজন।


আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের আগে পরামর্শ, পরে প্রতিবেদন
বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা কী অবস্থান নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যাচ্ছেন, কী প্রস্তাব দিচ্ছেন, কী অর্জন করছেন এবং কোথায় সীমাবদ্ধতা থাকছে, নাগরিকের তা জানার অধিকার রয়েছে।
একটি স্বাধীন বাংলাদেশ ডিজিটাল সহযোগিতা, ইন্টারনেট ও এআই গভর্ন্যান্স অবজারভেটরিও প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এটি ডিজিটাল বৈষম্য, সাইবার নিরাপত্তা, প্ল্যাটফর্ম জবাবদিহি, এআইয়ের সামাজিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করবে।


পাঁচ মাসের প্রকৃত হিসাব


পাঁচ মাস একটি প্রযুক্তিগত রূপান্তর সম্পন্ন করার জন্য যথেষ্ট সময় নয়। কিন্তু সরকারের দিকনির্দেশনা, অগ্রাধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি বোঝার জন্য এটি একেবারে অপ্রতুলও নয়।
এ পর্যন্ত সরকার একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী নকশা দিয়েছে। সেখানে স্টার্টআপ, এআই, ৫জি, ফাইবার, ডিজিটাল পরিচয়, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কথা আছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই নকশার নিচে কী ধরনের রাষ্ট্রীয় ভিত্তি নির্মিত হবে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সাফল্য সফটওয়্যারের সংখ্যা, সম্মেলনে অংশগ্রহণ, বিদেশি বিনিয়োগ বা বড় বাজেট দিয়ে এককভাবে পরিমাপ করা যাবে না।
প্রকৃত মূল্যায়ন হবে সাধারণ নাগরিক কম খরচে নির্ভরযোগ্য সেবা পাচ্ছেন কি না, তাঁর ব্যক্তিগত তথ্য নিরাপদ থাকছে কি না, ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছেন কি না এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রভাবের বাইরে কাজ করতে পারছে কি না।
ডিজিটাল রাষ্ট্র কোনো প্রযুক্তিগত প্রদর্শনী নয়। এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের একটি নতুন পদ্ধতি।
সেই ক্ষমতা স্বচ্ছ, সীমিত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক হলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নাগরিকের অধিকারকে শক্তিশালী করতে পারে, অর্থনীতিকে গতিশীল করতে পারে এবং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে পারে।
আর প্রতিষ্ঠান দুর্বল থাকলে একই প্রযুক্তি বৈষম্য, নজরদারি, তথ্যের অপব্যবহার ও অবিশ্বাসের অবকাঠামো হয়ে উঠতে পারে।
প্রথম পাঁচ মাসে পরিবর্তনের একটি নকশা দেখা গেছে। পরবর্তী পাঁচ মাস বলবে, সরকার সত্যিই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মাণ করছে, নাকি নতুন প্রকল্পের ওপর জেঁকে বসছে পুরোনো রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির আরেকটি প্রলেপ।

লেখকঃ নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিবাংলাটেক.নিউজ, সহ-সভাপতি, সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশন