মনোহরদীতে পানের বরজে ফিরছে সচ্ছলতা, কৃষকদের কাছে যেন ‘চলতি ব্যাংক’
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার গ্রামগুলোতে পান এখন কেবল একটি ফসল নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই পান চাষ করে দিন দিন স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন উপজেলার শত শত কৃষক। বিশেষ করে শুভ বিবাহ, ধর্মীয় উৎসব কিংবা অতিথি আপ্যায়নের অপরিহার্য এই অনুষঙ্গটি চাষ করে অনেক পরিবারে ফিরেছে সচ্ছলতা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিদেশে পান রপ্তানি পুনরায় শুরু হলে এই খাতের কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হতে পারবেন।
মনোহরদী উপজেলার মাটি ও আবহাওয়া পান চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় দীর্ঘকাল ধরে কৃষকরা হরেক প্রজাতির পানের আবাদ করছেন। চাষযোগ্য জাতগুলোর মধ্যে গয়ালস্বর, লালডিঙ্গি ও হাইব্রিড অন্যতম। এ ছাড়া বিশেষ ঔষধি গুণসম্পন্ন ‘মিষ্টি সাচি’ পানেরও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাঁশের কাঠি ও খড়ের ছাউনি দিয়ে তৈরি ছায়াঘেরা মনোরম বরজে নিবিড় পরিচর্যায় বেড়ে ওঠে এসব পানের লতা। অল্প পরিশ্রমে অধিক লাভ হওয়ায় দিন দিন পান চাষে ঝুঁকে পড়ছেন এলাকার নতুন নতুন উদ্যোক্তা।
স্থানীয় চাষিদের কাছে পানের বরজ যেন একেকটি 'চলতি ব্যাংক'। তাদের মতে, ভালো একটি পানের বরজ হলো নগদ অর্থের অফুরন্ত ভাণ্ডার। সারা বছরই এখান থেকে আয়ের সুযোগ থাকে। যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে বরজ থেকে তাৎক্ষণিক পান তুলে হাটে বিক্রি করে নগদ টাকা হাতে পাওয়া যায়।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বর্তমানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উপজেলায় প্রায় ৩০০ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হচ্ছে। চলতি মৌসুমে পান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন। উপজেলার সব ইউনিয়নে কম-বেশি পানের বরজ থাকলেও সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় লেবুতলা ও খিদিরপুর ইউনিয়নে। এই দুই ইউনিয়নের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ সরাসরি পান চাষ ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
অনেকে মূল পেশার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের জন্য পানের বরজ গড়ে তুলেছেন। বরজগুলো চারদিকে ঘেরা ও উপরে চালা থাকায় পরিবারের নারী সদস্যরাও ঘরের কাজের পাশাপাশি স্বাচ্ছন্দ্যে পরিচর্যা করতে পারেন।
পশ্চিম রামপুর গ্রামের সফল পান চাষি সুমন মিয়া জানান, ১০ বছর আগে মাত্র ৩০ শতাংশ জমিতে বরজ শুরু করেছিলেন তিনি। লাভজনক হওয়ায় এখন এর পরিধি বাড়িয়েছেন। তিনি বলেন, "১৪৪টি পানে '১ বিড়া' এবং ২০ বিড়ায় '১ কুড়ি' ধরা হয়। বর্তমানে এক কুড়ি পান সাইজভেদে ২ থেকে ৮ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিশেষ করে শীতকালে চাহিদা ও দাম—দুটোই বাড়ে। এই বরজ আমাদের কাছে জমানো ব্যাংকের মতো।"
আরেক চাষি কাসেম জানান, ৪০ শতাংশ জমিতে পান চাষ করতে বছরে প্রায় ২ লাখ টাকা খরচ হয়। বাজারদর ভালো থাকলে সব খরচ বাদ দিয়ে বছরে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা নিট লাভ করা সম্ভব। সরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণ ও সহযোগিতা পেলে তারা চাষের পরিধি আরও বাড়াতে পারতেন।
মনোহরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুনা আক্তার বলেন, "জিআই পণ্য হিসেবে পান একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও ঔষধি গুণসম্পন্ন অর্থকরী ফসল। কম খরচে অধিক লাভের সুযোগ থাকায় এটি চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। একসময় মনোহরদী থেকে বিদেশে পান রপ্তানি হয়েছিল, যা আপাতত বন্ধ রয়েছে। তবে আমরা কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে চাষিদের নিয়মিত প্রয়োজনীয় পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি।"
মানবকণ্ঠ/ডিআর




Comments