Image description

ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআরসি) ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ এক ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। দেশটির সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে এ পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, যা ইতিহাসের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।

শুক্রবার (৩১ জুলাই) কঙ্গোর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, দেশে বর্তমানে নিশ্চিতভাবে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৩২ জনে। এর মাধ্যমে দেশটি ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত চলা তাদের ১০ম প্রাদুর্ভাবের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেল। সেই সময় দেশটিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৪৭০ জন।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডাব্লিউএফপি) ভারপ্রাপ্ত প্রধান কার্ল স্কাউ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটি আমাদের দেখা সবচেয়ে দ্রুত বিস্তার লাভকারী ইবোলা মহামারি। এই পরিস্থিতির প্রতি গোটা বিশ্বের আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া জরুরি।’

কঙ্গোর জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন। অর্থাৎ এই রোগে মৃত্যুর হার দাঁড়িয়েছে ৪৪.১ শতাংশে। বর্তমানে ৮০৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন বা আইসোলেশনে আছেন এবং ৬২৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

আফ্রিকা সেন্টার্স ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (আফ্রিকা সিডিসি) জানিয়েছে, প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার তিন মাসেরও কম সময়ে রোগটি আগের যে কোনো মহামারির তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ইতিহাসে এর চেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব ছিল কেবল ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকার মহামারিটি, যেখানে গিনি, লাইবেরিয়া ও সিয়েরা লিওনে ২৮ হাজার ৬১৬ জন আক্রান্ত এবং ১১ হাজার ৩১০ জন মারা গিয়েছিলেন।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, কঙ্গোর বর্তমান মহামারিটি ইবোলা ভাইরাসের বিরল ‘বুন্দিবুগিও’ (Bundibugyo) স্ট্রেইনের কারণে ছড়িয়েছে। এই নির্দিষ্ট স্ট্রেইনের জন্য এখনো পর্যন্ত অনুমোদিত কোনো টিকা বা কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি উদ্ভাবন হয়নি।

চিকিৎসা কর্মীদের জন্য লড়াইটা শুধু ভাইরাসের সঙ্গেই নয়; কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা এবং নিরাপত্তার অভাব তাদের কাজের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ওপর বৈদেশিক সহায়তায় বড় ধরনের কাটছাঁট স্বাস্থ্যসেবা খাতকে চরম সংকটে ফেলেছে। পাশাপাশি সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার অভাব এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর বুনিয়ার দাতব্য সংস্থা ‘কারিতাস’-এর জরুরি সেবা প্রধান অ্যাঞ্জেলে গাপিও জানান, সচেতনতামূলক প্রচারণাতেও তেমন কাজ হচ্ছে না এবং প্রথম সারির স্বাস্থ্যকর্মীরা মারাত্মক ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। তিনি বলেন, “রোগটি এখন সামাজিকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষ এখনো প্রথাগত কবিরাজি চিকিৎসার ওপর নির্ভর করছে, যার ফলে সংক্রমণের ধারা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।”

পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে সতর্ক করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, ইবোলায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে চারগুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে। এদিকে গত জুন মাসে আফ্রিকা সিডিসি জানিয়েছিল, এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে প্রায় ১৪০ কোটি ডলার প্রয়োজন, যা তাদের আগের প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় তিনগুণ বেশি।

বর্তমানে কঙ্গোর পাঁচটি প্রদেশ— হাউত-উয়েলে, ইতুরি, উত্তর কিভু, দক্ষিণ কিভু এবং তশোপো এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের প্রকোপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

সূত্র: আল-জাজিরা।

মানবকণ্ঠ/ডিআর