গত প্রায় দেড়শো বছরে প্রজাতি হিসেবে মানুষ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে লম্বা হয়েছে। তবে সেই দিন হয়তো শেষের দিকে। আর এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সামনে আসছে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আরও চরম আবহাওয়া, তাপপ্রবাহ ও বাড়তি আর্দ্রতা সৃষ্টির কথা সবারই জানা। নতুন করে এখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক দেখছেন, এই অবস্থা জন্মের আগেই শিশুদের বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
গবেষক দলটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচ বছরের কম বয়সী ২ লাখ শিশুর ওপর গবেষণা চালিয়েছে। তারা অনুমান করেছেন, যেসব শিশু মাতৃগর্ভে থাকার সময় গর্ভাবস্থার প্রতিটি ত্রৈমাসিকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা ও উচ্চ আর্দ্রতার সম্মুখীন হয়েছে, তারা তাদের বয়স অনুযায়ী প্রত্যাশিত উচ্চতার তুলনায় ১৩ শতাংশ খাটো হবে। জন্ম থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত উচ্চতা বৃদ্ধি একটি শিশুর সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়।
যদিও একজন মানুষের চূড়ান্ত উচ্চতা অনেকাংশে জিনগত বৈশিষ্ট্য, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যের মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে, তবে প্রধান গবেষক কেটি ম্যাকমাহন তাদের গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বেড়ে যাওয়া তাপমাত্রা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের গড় উচ্চতা কমিয়ে দিতে পারে। তিনি আরও বলেন, “বৈশ্বিক চিত্র এখনও অনিশ্চিত থাকলেও আগামী দশকগুলোতে প্রশমন ও অভিযোজনের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। আমরা যুক্তিসংগতভাবেই ধরে নিতে পারি যে, উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার প্রভাবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের অন্যান্য দেশেও একই ধরনের ফলাফল দেখা যেতে পারে।”
মানব উচ্চতায় ‘কনসার্টিনা’ প্রভাব
বিজ্ঞানীরা জানেন, ইতিহাসজুড়ে মানুষের উচ্চতায় বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে একাধিক গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ১০ হাজার বছর আগে শিকারি জীবনধারা থেকে কৃষিনির্ভর জীবনে যাওয়ার শুরুর দিকে মানুষের গড় উচ্চতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। আরও সাম্প্রতিক সময়ের কথা বললে, ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক রিচার্ড স্টেকেল একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করেন। তিনি নবম থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যে উত্তর ইউরোপের বিভিন্ন সমাধিস্থল থেকে উদ্ধার করা হাজার হাজার কঙ্কালের উচ্চতার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেন, এই সময়ে গড় উচ্চতা ওঠানামা করেছে এবং সপ্তদশ শতাব্দীতে তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।
সে সময় ইউরোপ নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এর মধ্যে ছিল শহরের সম্প্রসারণ, যা সংক্রামক রোগের বিস্তার বাড়িয়েছিল; কৃষি উৎপাদনে পরিবর্তন; এমনকি ‘লিটল আইস এজ’ বা শীতল সময়কাল, যার স্থায়িত্ব ছিল ষোড়শ থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত। অধ্যাপক স্টেকেল তাঁর গবেষণায় লিখেছেন, “সপ্তদশ শতাব্দী নাগাদ উত্তর ইউরোপের পুরুষদের গড় উচ্চতা প্রায় আড়াই ইঞ্চি (৬.৪ সেন্টিমিটার) কমে গিয়েছিল, যা বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের আগ পর্যন্ত পুরোপুরি ফিরে আসেনি।”
যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের জনস্বাস্থ্য গবেষক ড. আন্দ্রেয়া রদ্রিগেজ মার্টিনেজ মানুষের উচ্চতার প্রবণতা নিয়ে একাধিক গবেষণাপত্র লিখেছেন। তাঁর আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তন আধুনিক জনসংখ্যার ওপরও একই ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তিনি বলেন, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় এক বিলিয়ন (১০০ কোটি) শিশু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের ‘অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকিতে’ রয়েছে। বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন বিভিন্নভাবে শিশুদের বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে।




Comments