Image description

বরফে এখনো জমাট আর্কটিকের পানি। চারপাশে তীব্র ঠান্ডা আর বিপজ্জনক বরফের স্তর। এর মধ্যেই মে মাসের শেষদিকে রাশিয়ার উত্তরাঞ্চল থেকে যাত্রা শুরু করে বিশাল LNG ট্যাংকার Christophe de Margerie।

গন্তব্য রাশিয়ার সুদূর পূর্বাঞ্চল। জাহাজটির যাত্রাপথ ছিল রাশিয়ার নিয়ন্ত্রিত Northern Sea Route বা উত্তর সাগরপথ। বরফ ভেদ করে এগিয়ে যেতে বেশিরভাগ পথেই এর সঙ্গে ছিল আইসব্রেকার।

প্রায় দুই সপ্তাহের যাত্রা শেষে ট্যাংকারটি পৌঁছায় রাশিয়ার Kamchatka Peninsula-তে। সেখানেই ঘটে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ঘটনা। স্যাটেলাইট ছবি ও জাহাজ চলাচলের তথ্যের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, Christophe de Margerie একটি বিশাল ভাসমান স্টোরেজ ইউনিটের পাশে অবস্থান নেয়। জাহাজ ও ভাসমান স্টোরেজের অবস্থান দেখে সেটিকে ship-to-ship LNG স্থানান্তরের সম্ভাব্য ব্যবস্থা হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

অর্থাৎ, আর্কটিকের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আনা রুশ গ্যাস সরাসরি বড় বাজারে না গিয়ে প্রথমে ভাসমান স্টোরেজে রাখা হচ্ছে। এরপর সেই গ্যাস যাচ্ছে চীনের দিকে। আর এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে চীন-রাশিয়া সম্পর্ক। মার্কিন ও ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার Arctic LNG 2 প্রকল্প বড় ধরনের চাপে রয়েছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীন এই প্রকল্পের LNG-এর গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা হিসেবে উঠে এসেছে।

Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে চীনের দক্ষিণাঞ্চলের Beihai LNG terminal-এ Arctic LNG 2-এর গ্যাস পৌঁছাতে শুরু করে। জাহাজ-ট্র্যাকিং তথ্যের হিসাবে, কয়েক মাসের মধ্যে এই টার্মিনালে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন রুশ LNG পৌঁছেছে। আরও বড় বিষয় হলো- এই সরবরাহের জন্য রাশিয়া একাধিক বিকল্প পথ ব্যবহার করছে।

শীতকালে Northern Sea Route বরফে প্রায় অচল হয়ে পড়ায় জাহাজগুলোকে দীর্ঘ সমুদ্রপথে ঘুরে চীনে যেতে হয়। কিন্তু গ্রীষ্মে বরফ কিছুটা কমলে আর্কটিকের এই রুট হয়ে ওঠে তুলনামূলক দ্রুত একটি পথ। এবার সেই পথেই আবার সক্রিয় হচ্ছে রুশ LNG পরিবহন। একই সঙ্গে চীনের ভূমিকাও বাড়ছে। জুনে Reuters জানায়, Arctic LNG 2-এর গ্যাস গ্রহণের জন্য চীন Longkou LNG terminal-কেও প্রস্তুত করছে। এর ফলে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা রুশ LNG গ্রহণের ক্ষেত্রে চীনের সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে।

শুধু গ্যাস নয়- ২০২৬ সালে রাশিয়ার এশিয়ামুখী তেল পরিবহনও Northern Sea Route দিয়ে দ্রুত বাড়ছে। Reuters-এর ১১ আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মৌসুমে এ রুট দিয়ে ইতোমধ্যে প্রায় ৬ মিলিয়ন ব্যারেল রুশ অপরিশোধিত তেল এশিয়ার পথে রয়েছে—যা ২০২৫ সালের পুরো মৌসুমে পরিবহনের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি। চীনই এই প্রবাহের প্রধান ক্রেতা হিসেবে উঠে এসেছে। আর এর পেছনে শুধু অর্থনীতি নয়, রয়েছে ভূরাজনীতিও।

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো যখন যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে থাকা এই পথকে বিকল্প বাণিজ্য করিডর হিসেবে দেখছে মস্কো ও বেইজিং। চীনের জন্য এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘদিন ধরেই বেইজিং নিজেকে ‘near-Arctic state’ হিসেবে উপস্থাপন করে আর্কটিক অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বরফ গলছে। ফলে ভবিষ্যতে বছরের আরও দীর্ঘ সময় Northern Sea Route ব্যবহারযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। আর সেটিই আর্কটিককে পরিণত করছে নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মঞ্চে।

রাশিয়ার কাছে এই পথ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ। চীনের কাছে এটি ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রপথ এড়িয়ে জ্বালানি পাওয়ার আরেকটি সম্ভাব্য পথ। আর পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে প্রশ্ন- রাশিয়া-চীনের এই ক্রমবর্ধমান আর্কটিক সহযোগিতা কি ভবিষ্যতে শুধু বাণিজ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?

কারণ বাণিজ্যের পাশাপাশি আর্কটিকে চীনা জাহাজ চলাচল, অবকাঠামো ও রাশিয়ার সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ছে। ফলে আজকের বরফঢাকা এই সমুদ্রপথ আগামী দিনে হয়ে উঠতে পারে জ্বালানি, বাণিজ্য ও সামরিক প্রভাব বিস্তারের নতুন কৌশলগত করিডর।

এম আর এ