Image description

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পোশাকের বাজারে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে বড় ধরনের সংকোচন দেখা দিয়েছে। এ সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইইউর পোশাক আমদানির মূল্য কমেছে ৯ দশমিক ৭০ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক রফতানি কমেছে আরও বেশি—১৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) সংকলন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ইইউ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ৪১ দশমিক ১০ বিলিয়ন ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ।

অন্যদিকে, একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক রফতানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ইউরো। অর্থাৎ ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানি যতটা কমেছে, বাংলাদেশের রফতানি কমেছে তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ হারে।

বাংলাদেশের পোশাক রফতানির পরিমাণও কমেছে ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। পাশাপাশি পোশাকের গড় দাম কমেছে ৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ফলে একদিকে কম পরিমাণ পণ্য রফতানি হয়েছে, অন্যদিকে কম দামে তা বিক্রি করতে হয়েছে। এতে রফতানি আয়ের ওপর দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।

প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বাংলাদেশের পতন বেশি

ইইউর বাজার সংকুচিত হওয়ায় বাংলাদেশের পাশাপাশি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর পোশাক রফতানিও কমেছে। প্রথম ছয় মাসে চীনের রফতানি কমেছে ৮ দশমিক ৮৮ শতাংশ, তুরস্কের ১৪ দশমিক ৬০ শতাংশ, ভারতের ১২ দশমিক ৪৯ শতাংশ, পাকিস্তানের ১২ দশমিক ৫৩ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১১ দশমিক ২১ শতাংশ এবং কম্বোডিয়ার ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

তবে এসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের রফতানি কমেছে বেশি।

এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনামের চিত্রটি ভিন্ন। দেশটির পোশাক রফতানি ছয় মাসে ০ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। যদিও তাদের রফতানির পরিমাণ কমেছে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ, তবে পোশাকের গড় দাম বেড়েছে ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। ফলে কম পরিমাণ পণ্য রফতানি করেও ভিয়েতনাম মোট রফতানি আয় সামান্য বাড়াতে পেরেছে।

জুনে কিছুটা স্বস্তি

ছয় মাসের সামগ্রিক চিত্র নেতিবাচক হলেও জুনে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে সামান্য উন্নতি হয়েছে। এ মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ০ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে।

জুনে রফতানির পরিমাণ বেড়েছে ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ। তবে একই সময়ে পোশাকের গড় দাম কমেছে ৫ দশমিক ৩১ শতাংশ। অর্থাৎ বেশি পরিমাণ পোশাক রফতানি হলেও কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে।

এর আগে জানুয়ারি-মে পাঁচ মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমেছিল ১৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ। ওই সময়ে রফতানির পরিমাণ কমে ১০ দশমিক ৪৬ শতাংশ এবং গড় দাম কমে ৯ দশমিক ৪১ শতাংশ।

দুর্বল চাহিদার সঙ্গে বাড়ছে প্রতিযোগিতার চাপ

ইউরোপ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার হওয়ায় সেখানে চাহিদা কমে গেলে সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের পোশাকশিল্পে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদহার, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও ভোক্তাদের ব্যয় কমানোর প্রবণতা ইউরোপের পোশাকের অর্ডারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

একই সঙ্গে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলোও সরবরাহকারীদের কাছ থেকে কম দামে পণ্য নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের একদিকে কম অর্ডারের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে, অন্যদিকে কম দামে পণ্য সরবরাহের চাপও সামলাতে হচ্ছে।

কম দামে বেশি রফতানি কতটা টেকসই

বাংলাদেশের পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক কম দামে বিপুল পরিমাণ পোশাক সরবরাহের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। তবে বাজার সংকুচিত হলে শুধু কম দামে বেশি পণ্য বিক্রির কৌশল কতটা কার্যকর থাকবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে ভিয়েতনামের উদাহরণ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশটি কম পরিমাণ পোশাক রফতানি করেও বেশি দামে পণ্য বিক্রি করে আয় বাড়াতে পেরেছে।

এ অবস্থায় বাংলাদেশের সামনে শুধু উৎপাদন ও রফতানির পরিমাণ বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ নয়; বরং বেশি মূল্য সংযোজন, উন্নতমানের পণ্য এবং তুলনামূলক বেশি দামের বাজারে প্রবেশের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

ইইউর বাজারে বাংলাদেশের রফতানি কমার বিষয়টি শুধু বর্তমান রফতানি আয়ের ওপর প্রভাব ফেলছে না, ভবিষ্যৎ বাজার ধরে রাখার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি তৈরি করছে। কোনো ব্র্যান্ড অর্ডার কমিয়ে দিলে সেই অর্ডার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের সরবরাহকারীদের কাছে চলে যেতে পারে। পরবর্তী সময়ে বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও সেই অর্ডার ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে।

তাই বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ইউরোপের সামগ্রিক বাজার সংকোচনের মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় নিজেদের বাজার ধরে রাখা এবং কম দামের বদলে বেশি মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে রফতানি আয় বাড়ানো।

এসএস