মুসলিম সেজে মসজিদে এফবিআইয়ের গুপ্তচর, তাকেই উগ্রবাদী ভেবে রিপোর্ট মুসল্লিদের
দুই দশক পরও চলছে মামলা
ক্যালিফোর্নিয়ার মসজিদে নজরদারির জন্য এফবিআইয়ের নিয়োগ করা গোপন ইনফরম্যান্ট ক্রেইগ মন্টেইল ছদ্মবেশে | ক্যালিফোর্নিয়ার মসজিদে নজরদারির জন্য এফবিআইয়ের নিয়োগ করা গোপন ইনফরম্যান্ট ক্রেইগ মন্টেইল ছদ্মবেশে
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় মুসলিম কমিউনিটির মধ্যে ঢুকে তথ্য সংগ্রহের জন্য এফবিআইয়ের নিয়োগ করা এক গোপন ইনফরম্যান্টকেই শেষ পর্যন্ত সম্ভাব্য উগ্রবাদী মনে করেছিলেন মুসল্লিরা। তার কথাবার্তায় সন্দেহ তৈরি হলে তাকে স্থানীয় পুলিশ ও এফবিআইয়ের কাছে রিপোর্টও করেছিলেন তারা।
ঘটনার শুরু ২০০৬ সালে। এফবিআইয়ের পেইড ইনফরম্যান্ট হিসেবে কাজ করা ক্রেইগ মন্টেইল মুসলিম পরিচয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার অরেঞ্জ কাউন্টির ইসলামিক সেন্টার অব আরভাইনে যাতায়াত শুরু করেন। তিনি নিজেকে ফরাসি-সিরীয় বংশোদ্ভূত এবং ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দেন।
পরে জুমার নামাজে মুসল্লিদের সামনে শাহাদাহ পাঠ করে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন তিনি। এরপর ‘ফারুক আল আজিজ’ নাম ব্যবহার করে নিয়মিত মসজিদে যাতায়াত শুরু করেন। আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনি কখনো কখনো দিনে একাধিকবার নামাজে অংশ নিতেন এবং ধর্মীয় ক্লাস ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। একইসঙ্গে অরেঞ্জ কাউন্টির আরও কয়েকটি মসজিদেও তার যাতায়াত ছিল।
মুসল্লিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করার পাশাপাশি তিনি গোপনে তথ্য সংগ্রহ করছিলেন। মামলার নথিতে বাদীদের অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, এই অভিযানে ফোন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা এবং অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং সংগ্রহ করা হয়েছিল। মসজিদ, বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও নজরদারির অভিযোগ ওঠে। মন্টেইল পরে সংবাদমাধ্যমকে বলেন, প্রায় ১৪ মাসের এই কাজে তিনি এফবিআইয়ের কাছ থেকে ১ লাখ ৭৭ হাজার ডলার পেয়েছিলেন। তার দাবি অনুযায়ী, অরেঞ্জ, লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান বার্নার্ডিনো কাউন্টির প্রায় ১২টি মসজিদে তিনি তথ্য সংগ্রহ করেন। তবে অভিযানের সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা ঘটে পরে।
মন্টেইল যখন সহিংস জিহাদ, অস্ত্র এবং সহিংস কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলতে শুরু করেন, তখন মুসল্লিদের মধ্যে তার প্রতি সন্দেহ তৈরি হয়। একপর্যায়ে তাকে সম্ভাব্য উগ্রবাদী মনে করে স্থানীয় পুলিশ ও এফবিআইকে খবর দেন তারা। তার বিরুদ্ধে মসজিদে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা এবং restraining order-ও নেওয়া হয়। তখনও মুসল্লিরা জানতেন না, যাকে তারা সন্দেহ করছেন, তিনিই এফবিআইয়ের হয়ে কাজ করছেন।
২০০৯ সালে মন্টেইলের পরিচয় প্রকাশ্যে আসার পর ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে আলোচনায় আসে। মুসলিম কমিউনিটির অভিযোগ ছিল, তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ব্যাপক নজরদারি চালানো হয়েছে। তবে এফবিআইয়ের অবস্থান ছিল, অভিযানটি সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধের তদন্তের অংশ এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সম্ভাব্য সন্ত্রাসী তৎপরতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা যাচাই করাই ছিল উদ্দেশ্য। ২০১১ সালে ইয়াসির ফাজাগা, আলী মালিক ও ইয়াসের আবদেলরহিমসহ বাদীরা যুক্তরাষ্ট্র সরকার, এফবিআই ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় ধর্মীয় বৈষম্য, গোপন নজরদারি এবং সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়।
মামলাটি পরে FBI v. Fazaga নামে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে যায়। ২০২২ সালের ৪ মার্চ আদালত সর্বসম্মত রায়ে বলে, Foreign Intelligence Surveillance Act বা FISA সরকারের ‘state secrets privilege’ বাতিল করে না। তবে ওই রায়ে আদালত নজরদারি বেআইনি ছিল কি না কিংবা বাদীদের অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করেনি।
মামলার আইনি লড়াই অবশ্য সেখানেই শেষ হয়নি। ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট আবারও মামলাটি গ্রহণ করে আগের রায় বাতিল করে Ninth Circuit-এ ফেরত পাঠায় এবং সেখান থেকে মামলাটি নিম্ন আদালতে পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দেয়। প্রায় দুই দশক আগের এই ঘটনা তাই এখনও যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও জাতীয় নিরাপত্তার তদন্তে সরকারের ক্ষমতার সীমা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন তৈরি করে রেখেছে।
সূত্র: যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের নথি
এম আর এ




Comments