Image description

ইরান যুদ্ধকে ঘিরে একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সঙ্গেও টানাপোড়েন তৈরি করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমানোর নির্দেশ এবং হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনার জেরে ওমানকে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দেওয়ার ঘটনায় তার পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

রোববার ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর নির্দেশ দেন। এর কারণ হিসেবে তিনি মহড়ার ব্যয়, ইরান ইস্যুতে দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতা না করা এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে নিজের ভালো সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন।

বার্ষিক ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ মহড়া ১৭ আগস্ট শুরু হওয়ার কথা ছিল। Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, এবারের মহড়ায় প্রায় ১৮ হাজার দক্ষিণ কোরীয় সেনা অংশ নেওয়ার কথা ছিল। মহড়ায় ড্রোন, সাইবার যুদ্ধ ও জিপিএস বিঘ্নিত হওয়ার মতো আধুনিক হুমকি মোকাবিলার প্রশিক্ষণও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ফের যোগাযোগের আগ্রহ। সোমবার তিনি জানান, কিম জং উন তার সাম্প্রতিক যোগাযোগের জবাব দিয়েছেন। তবে কিম কী জবাব দিয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।

প্রথম মেয়াদেও কিমের সঙ্গে সরাসরি কূটনীতিতে জোর দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে সেই সময়ে দুই নেতার বৈঠক ও আলোচনায় বড় কোনো পারমাণবিক সমঝোতা হয়নি। এদিকে উত্তর কোরিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়িয়েছে এবং রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়াকে চাপ দেওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আরেক মিত্র ওমানের সঙ্গেও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে ওমান ইরানের সঙ্গে আলোচনা করছে। এই আলোচনায় ওমান যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টার পথে বাধা দেয়, তাহলে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।

ওমানের সঙ্গে এই উত্তেজনার সময়ই ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্বর্তী সমঝোতার ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হয়েছে। তবে সমঝোতাটি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কার্যকর ছিল—এমনটি বলা ঠিক হবে না। Reuters জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যকার সমঝোতা জুলাইয়ের শুরুতেই কার্যত ভেঙে পড়েছিল। ৬০ দিনের সময়সীমা ছিল একটি চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য নির্ধারিত সময়। এদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে অচলাবস্থা অব্যাহত রয়েছে। Reuters-এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ওই জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে এবং তেলের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র অন্তর্বর্তী সমঝোতার শর্ত পূরণ না করলে তারা হরমুজ প্রণালিতে আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে। সোমবার এক ইরানি কর্মকর্তা Reuters-কে বলেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তেহরান প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান থেকে ‘পূর্ণ আক্রমণাত্মক’ অবস্থানে যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। সমালোচকদের অভিযোগ, মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে চাপ ও অর্থনৈতিক হিসাবকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি ট্রাম্প ব্যক্তিগত সম্পর্ককে কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।

তবে ট্রাম্পের সমর্থকদের যুক্তি, দীর্ঘদিনের মিত্রদের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আরও বেশি সহযোগিতা ও ব্যয়ভার ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের উদ্যোগকেও তারা সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধানের পথ হিসেবে দেখছেন। সব মিলিয়ে ইরান যুদ্ধ, হরমুজ সংকট, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক এবং উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের পররাষ্ট্রনীতিকে বড় পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

সূত্র: Reuters, Associated Press ও CNN-এর ১৬-১৮ আগস্ট ২০২৬-এর প্রতিবেদন ও সম্প্রচার।

এম আর এ