বিপদে পড়ে কিংবা নির্যাতনের শিকার হয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হওয়া শিশুর কাছে পুলিশের পোশাক যেন আতঙ্কের কারণ না হয়—বরং হয়ে উঠতে হবে নিরাপদ আশ্রয়ের প্রতীক। ভয় দেখিয়ে বা কঠোর আচরণে নয়, শিশুর মনে নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করে তার কথা শুনতে হবে। তাহলেই ভয়, লজ্জা কিংবা মানসিক ট্রমায় গুটিয়ে থাকা শিশুও নির্ভয়ে নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা বলতে পারবে। আর তাতে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের পাশাপাশি শিশুর জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও মনো-সামাজিক সহায়তা নিশ্চিত করাও সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বুধবার (১৯ আগস্ট) রাজশাহী পুলিশ লাইন্সের পিওএম কনফারেন্স রুমে পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য আয়োজিত মনো-সামাজিক পরিচর্যা বিষয়ক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে এসব বিষয় উঠে আসে। রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের রাজশাহী শহর এরিয়া ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম যৌথভাবে এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করে।
প্রশিক্ষণে শিশুদের সঙ্গে পুলিশের আচরণ, নির্যাতন ও ট্রমার প্রভাব, নিরাপদ যোগাযোগ, কাউন্সেলিং এবং মনো-সামাজিক সহায়তা দেওয়ার কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। প্রশিক্ষকদের মতে, নির্যাতনের শিকার একটি শিশু অনেক সময় ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ কিংবা গভীর মানসিক চাপে নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনা প্রকাশ করতে পারে না। এ অবস্থায় পুলিশের আচরণ যদি তার কাছে আরও ভীতিকর হয়ে ওঠে, তাহলে শিশুটি আরও বেশি গুটিয়ে যেতে পারে। এতে প্রকৃত ঘটনা জানা ও তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
প্রশিক্ষণের উদ্বোধন করে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির বলেন, ‘বিপদগ্রস্ত বা নির্যাতনের শিকার কোনো শিশু পুলিশের কাছে এলে তার সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে ভয় নয়, আস্থা তৈরি করতে হবে। শিশুর মনে নিরাপত্তাবোধ তৈরি করতে পারলে সে নিজের কথা সহজে বলতে পারবে এবং প্রকৃত ঘটনা জানা সম্ভব হবে। তাই শিশুদের সঙ্গে কাজ করা পুলিশ কর্মকর্তাদের মানবিক, ধৈর্যশীল ও সংবেদনশীল হওয়ার বিকল্প নেই।’
দিনব্যাপী প্রশিক্ষণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর মুরশিদা ফেরদৌস বিনতে হাবিব শিশুদের মানসিক বিকাশ, ট্রমার প্রভাব, ভিকটিম শিশুর আচরণগত পরিবর্তন, নিরাপদ যোগাযোগ এবং মনো-সামাজিক সহায়তার বিভিন্ন কৌশল তুলে ধরেন। একই সঙ্গে শিশু আইন-২০১৩-এর আলোকে শিশু সুরক্ষা, ভিকটিম শিশুর মানসিক অবস্থা বোঝা এবং কার্যকর কাউন্সেলিংয়ের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, নির্যাতনের শিকার শিশুর কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশ্ন করার ধরন ও পুলিশের আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে বারবার জিজ্ঞাসাবাদ না করে তার মানসিক অবস্থার প্রতি সংবেদনশীল থেকে নিরাপদ পরিবেশে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। এতে শিশুর ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ তৈরি হবে না এবং তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যও অধিক নির্ভরযোগ্যভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে।
প্রশিক্ষণে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কাশিয়াডাঙ্গা, রাজপাড়া, বোয়ালিয়া, মতিহার, চন্দ্রিমা ও শাহমখদুম থানার নারী ও শিশু হেল্প ডেস্কের কর্মকর্তা, এএসআই, এসআই ও ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার ৩০ জন এবং ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের পাঁচজন কর্মকর্তা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের রাজশাহী শহর এরিয়া ডেভেলপমেন্ট কো-অর্ডিনেশন অফিসের সিনিয়র ম্যানেজার লোটাস চিসিম। তিনি জানান, শিশু আইন-২০১৩-এর আলোকে শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে থানা নারী ও শিশু হেল্প ডেস্কের সঙ্গে ‘সিটিজেন ভয়েস অ্যান্ড অ্যাকশন’ ইন্টারফেস মিটিংয়ের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন ও উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর) মোহাম্মদ খোরশেদ আলম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ রাজশাহী শহর এডিপির প্রোগ্রাম অফিসার রিপন হালদার।
এ সময় ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের রাজশাহীর সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার নীলু বেগম, প্রোগ্রাম অফিসার ফিলিপ আরিন্দা, জুনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার মোসা. শারমিন সুরভী আক্তার ও অর্জুন রায়সহ অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন।
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মতে, শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে তাদের মানসিক অবস্থাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। পুলিশের কাছে আসা একটি শিশুর জন্য প্রথম প্রয়োজন নিরাপত্তা, এরপর প্রয়োজন তার কথা মন দিয়ে শোনা। এই মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই শিশুবান্ধব পুলিশিংকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।
এসএ




Comments