Image description

উত্তরাঞ্চলে সারের সংকট কাটছে না। সরকারি গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও কৃষকের হাতে চাহিদামতো সার পৌঁছাচ্ছে না। অভিযোগ উঠেছে, একশ্রেণির ডিলার গুদাম থেকে সার তুলে কালোবাজারে বিক্রি করছেন। ফলে খুচরা বাজারে চড়া দামে সার কিনতে হচ্ছে কৃষকদের।

সারের এই পরিস্থিতিতে বরেন্দ্র অঞ্চলে আমন ধানের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ডিলারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ উঠেছে কয়েকজন কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও। অভিযোগের পর উত্তরাঞ্চলের ১৫ জেলার কৃষি কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি মেহেরপুর, রাজশাহী ও জয়পুরহাটের তিন কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ডরিলিজ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশে ইউরিয়াসহ সব ধরনের সারের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে। বাফার গুদাম, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও সার রয়েছে। এরপরও মাঠে কৃষকের কাছে সার না পৌঁছানোর কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ফয়সাল ঈমাম জানান, সরকার ডিলারদের প্রতি কেজি সারে দুই টাকা কমিশন দিচ্ছে। কিন্তু কিছু ডিলার এর সঙ্গে আরও ৪ থেকে ৫ টাকা বাড়িয়ে সার বিক্রি করছেন। আবার অনেক ডিলার নিয়মিত গুদাম থেকে বরাদ্দের সার তুলছেন না।

তার ভাষ্য, গত দুই মাসে অনেক ডিলার বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক সার উত্তোলন করেছেন। কেউ টাকা জমা দিয়েও সার তোলেননি। এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে না জানানোর বিষয়েও জেলা কৃষি কর্মকর্তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

রাজশাহী বিভাগের আট জেলা—রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, জয়পুরহাট, বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ এবং রংপুর বিভাগের সাত জেলা—রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষি কর্মকর্তাদের শোকজ করা হয়েছে। তিন দিনের মধ্যে তাদের জবাব দিতে বলা হয়েছে।

এদিকে সারের অবৈধ মজুত ও কালোবাজারি ঠেকাতে বিভিন্ন জেলায় অভিযান চলছে। সোমবার বিভিন্ন অভিযানে ৮১১ বস্তা সার জব্দ এবং এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

রাজশাহীতে কৃষি কর্মকর্তাকে বদলি

সারের কালোবাজারি ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার অভিযোগে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিনকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। তাকে সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরের কোয়ারেন্টাইন বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন শরীয়তপুরের উপপরিচালক কামাল হোসেন।

ভূরুঙ্গামারীতে সার লুট

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে ডিলারের গুদাম থেকে সার লুটের ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছে। রোববার শিলখুড়ি ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার মুকুল হাজীর গুদামের বেড়া ভেঙে কৃষকরা ২০২ বস্তা সার নিয়ে যান। পরে ১১৫ বস্তা সার উদ্ধার করা হয়েছে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা কালোবাজারে সার বিক্রি করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি ডিলার ও কৃষকদের বক্তব্য নিচ্ছে।

চরফ্যাশনে ১৭৫ বস্তা সার জব্দ

ভোলার চরফ্যাশনে পাচারের সময় ১৭৫ বস্তা সারসহ দুলাল নামে এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ ও কোস্টগার্ড। স্থানীয়দের অভিযোগ, সারগুলো মিয়ানমারে পাচারের জন্য নেওয়া হচ্ছিল। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।

বিভিন্ন জেলায় জরিমানা

বগুড়ার নন্দীগ্রামে লাইসেন্স ছাড়া সার বিক্রি, মূল্যতালিকা না রাখা ও বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগে চার ব্যবসায়ীকে মোট ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে অবৈধভাবে সার মজুত রাখায় এক ব্যবসায়ীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে এক বিসিআইসি ডিলারকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা ও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযানে ৩৯১ বস্তা ইউরিয়া, ১৬০ বস্তা ডিএপি ও ৮৫ বস্তা এমওপি সার জব্দ করা হয়।

শঙ্কায় বরেন্দ্র অঞ্চলের আমন

রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিস্তীর্ণ বরেন্দ্র অঞ্চলে আমন ধান চাষ সেচ ও সারের ওপর নির্ভরশীল। সেচের ব্যবস্থা থাকলেও চাহিদামতো সার না পাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

কৃষকদের অভিযোগ, অসাধু ডিলাররা কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সরকারি সার খুচরা ও কীটনাশকের দোকানে সরিয়ে দিচ্ছেন। ফলে ৫০ কেজির এক বস্তা সারও কৃষকদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

রাজশাহী জেলায় বর্তমানে বিসিআইসির ৯৭ জন এবং বিএডিসির ১৩০ জন সার ডিলার রয়েছেন। চলতি আগস্টে এসব ডিলারের জন্য ১২ হাজার ২৬৯ টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা জুলাইয়ের তুলনায় ৬১০ টন বেশি। এরপরও বাজারে সার সংকট থাকায় ডিলারদের ভূমিকা ও মাঠপর্যায়ের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এসএস