Image description

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও বিভিন্ন সেবার খরচ বাড়ায় চাপে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। সংসারের খরচ সামলাতে অনেকেই খাবারের তালিকা ছোট করছেন, কম দামের পণ্য কিনছেন এবং প্রয়োজনীয় কিছু খরচও পিছিয়ে দিচ্ছেন।

পুরান ঢাকার বাসিন্দা সায়েদুল হক বলেন, দেড় বছর আগে বিয়ে করেছেন তিনি। ছাত্র পড়িয়ে ও স্ত্রীর চাকরির আয়ে সংসার চালান। কিন্তু নিত্যপণ্যের বাড়তি দামের কারণে সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, কয়েক মাস আগে এক হাজার টাকা বিদ্যুৎ রিচার্জ করে প্রায় ৩৫ দিন চললেও এখন একই পরিমাণ টাকায় অনেক কম সময় চলতে হচ্ছে। রান্নার গ্যাসের ক্ষেত্রেও খরচ বেড়েছে। একইভাবে সাবান, শ্যাম্পু ও কাপড় ধোয়ার পাউডারের মতো প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতেও আগের তুলনায় বেশি টাকা লাগছে।

খরচ কমাতে এখন সায়েদুল কম দামের ব্র্যান্ডের পণ্য কেনার কথা ভাবছেন। তার মতো অনেক পরিবারই বাড়তি খরচ সামলাতে পছন্দের পণ্য বাদ দিয়ে তুলনামূলক সস্তা বিকল্প বেছে নিচ্ছে।

খাবারের তালিকাতেও কাটছাঁট

দ্রব্যমূল্যের চাপে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে খাবারের তালিকায়। মৌচাকের বাসিন্দা কবির আহমেদ একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি করেন। পাঁচ সদস্যের পরিবার চালাতে গিয়ে তাকেও নিয়মিত বাজারের তালিকা পরিবর্তন করতে হচ্ছে।

কবির বলেন, আগে সপ্তাহে অন্তত একদিন মাছ বা মাংস রাখার চেষ্টা করতেন। এখন অনেক সময় মাংস বাদ দিয়ে ডিম কিনছেন। ডিমের দামও বেশি মনে হলে সেটির পরিমাণ কমিয়ে দিচ্ছেন।

তার ভাষায়, আগে বাজারে গিয়ে কী খাবেন, তা ভাবতেন। এখন ভাবতে হয়—কোন জিনিস বাদ দিলে মাসের খরচ সামলানো যাবে।

পরিবারের শিশুদের পছন্দের খাবার কিনতেও এখন হিসাব করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি। দুধ ও ফল নিয়মিত কেনা কমেছে, মাছ-মাংসের পরিমাণও কমেছে। বাইরে খাওয়াও প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন।

নিত্যপণ্যের দামেও চাপ

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চাল, আটা, ময়দা, তেল, ডিমসহ বিভিন্ন পণ্যের দামে সাম্প্রতিক সময়ে ওঠানামা হয়েছে। বাজারে পণ্যের সরবরাহ, পরিবহন খরচ ও জ্বালানির দামের প্রভাবও পড়ছে।

এদিকে শুধু দাম বাড়ানো নয়, কিছু পণ্যের পরিমাণ কমিয়েও একই বা কাছাকাছি দামে বিক্রি করা হচ্ছে। অর্থনীতিতে এই প্রবণতাকে ‘শ্রিংকফ্লেশন’ বলা হয়।

মোহাম্মদপুরের এক দোকানি জানান, কয়েকটি ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত পণ্যের ওজন কমেছে। ফলে ক্রেতা একই দামে আগের তুলনায় কম পণ্য পাচ্ছেন।

মূল্যস্ফীতি কমলেও স্বস্তি নেই

সরকারি হিসাবে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে নেমেছে, যা আগের মাসের ৯ দশমিক ১৬ শতাংশের চেয়ে কম। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও জুলাইয়ে ৭ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমেছে। তবে মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ এই নয় যে আগের বাড়তি দামগুলো কমে গেছে; বরং দাম বাড়ার গতি কমেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ, যা একই সময়ে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির চেয়ে সামান্য কম। ফলে অনেক মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ এখনও রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আনতে একদিকে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও আয় বাড়াতে হবে। পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জ্বালানি সংকটের প্রভাব উৎপাদন, পরিবহন ও শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপর পড়ে।

অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরীর মতে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ভালো মজুরির কর্মসংস্থান তৈরি করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ কে এ এস মুর্শিদের মতে, খাদ্য ও জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত না থাকলে দেশীয় বা বৈশ্বিক সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

সব মিলিয়ে সরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাজারে আগের বাড়তি দামের চাপ রয়ে গেছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের কাছে মাসের খরচ সামলানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।

এসএস