রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন ভারসাম্যের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ। তিনি ছিলেন বাড়াবাড়ি ছাড়া আল্লাহর বান্দা, কঠোরতা ছাড়া নেতা এবং কৃত্রিমতা ছাড়া শিক্ষক ও প্রশিক্ষক।
তাঁর জীবন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, জীবনের সব ক্ষেত্রে তিনি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনাচারে অভ্যস্ত ছিলেন।
ইবাদত ও পার্থিব জীবনের মধ্যে ভারসাম্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইবাদতে ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠদের একজন। কিন্তু তিনি দ্বিনকে এমন কোনো বোঝা বানাননি, যা মানুষকে সারাক্ষণ কষ্ট ও ক্লান্তির মধ্যে রাখে; বরং তিনি দ্বিনের মধ্যে সহজতা ও রহমতের শিক্ষা দিয়েছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই এই দ্বিন সহজ। আর যে ব্যক্তি দ্বিনের ব্যাপারে অতিরিক্ত কঠোরতা অবলম্বন করবে, দ্বিন তাকে পরাভূত করবে। অতএব, তোমরা সঠিক পথে থাকো, সাধ্যের কাছাকাছি থাকো, সুসংবাদ গ্রহণ করো এবং সহজ করো।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৯)
একবার তিনজন ব্যক্তি তাঁর ইবাদত সম্পর্কে জানতে এসে তা নিজেদের কাছে কম মনে করলেন। একজন বললেন—‘আমি সব সময় রোজা রাখব, কখনো রোজা ছাড়ব না।’ অন্যজন বললেন, ‘আমি সারা রাত নামাজ পড়ব, ঘুমাব না।’ তৃতীয়জন বললেন, ‘আমি কখনো বিয়ে করব না।’
তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের মধ্যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি এবং সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান। কিন্তু আমি রোজা রাখি এবং রোজা ছাড়িও; নামাজ পড়ি এবং ঘুমাই; আর আমি নারীদের বিয়ে করি। সুতরাং যে আমার সুন্নত থেকে বিমুখ হয়, সে আমার অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০৬৩)
অর্থাৎ, ইবাদত থাকবে, কিন্তু তা জীবনের অন্যান্য বৈধ অধিকার নষ্ট করে নয়।
আল্লাহর হক, নিজের হক ও মানুষের হকের মধ্যে ভারসাম্য
সালমান ফারসি (রা.) ও আবু দারদা (রা.)-এর ঘটনা এ বিষয়ে অত্যন্ত শিক্ষণীয়। সালমান (রা.) দেখলেন, আবু দারদা (রা.) অতিরিক্ত ইবাদতে এমনভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন যে নিজের শরীর ও পরিবারের অধিকারও উপেক্ষিত হচ্ছে। তখন সালমান (রা.) তাঁকে বললেন, ‘নিশ্চয়ই তোমার ওপর তোমার নিজের অধিকার আছে, তোমার রবেরও তোমার ওপর অধিকার আছে, তোমার অতিথিরও তোমার ওপর অধিকার আছে এবং তোমার পরিবারেরও তোমার ওপর অধিকার আছে। অতএব প্রত্যেক অধিকারীকে তার অধিকার দাও।’
এরপর তাঁরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গেলে তিনি সালমান (রা.)-এর কথা শুনে বললেন, ‘সালমান সত্য বলেছে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৯৬৮)
এখানে ভারসাম্যের অর্থ হলো একটি অধিকার পূরণ করতে গিয়ে অন্য অধিকার ধ্বংস না করা।
দয়া ও দৃঢ়তার মধ্যে ভারসাম্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দয়ালু। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের কারণেই আপনি তাদের প্রতি কোমল হয়েছেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯)
কিন্তু তাঁর কোমলতা কখনো সত্য ও ন্যায়ের সঙ্গে আপস করার অর্থ ছিল না। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে যখনই দুটি বিষয়ের মধ্যে নির্বাচন করতে দেওয়া হতো, তিনি পাপের বিষয় না হলে সহজতরটিই গ্রহণ করতেন। আর যদি তা পাপের বিষয় হতো, তবে তিনি তা থেকে সবার চেয়ে দূরে থাকতেন। আল্লাহর কসম! তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়ে তাঁকে কষ্ট দেওয়া হলে তিনি কখনো নিজের জন্য প্রতিশোধ নেননি; তবে আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয় লঙ্ঘিত হলে তিনি আল্লাহর জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১২৬)
সুতরাং ভারসাম্য হলো দয়া মানে সত্যকে দুর্বল করে দেওয়া নয়, আর দৃঢ়তা মানে হৃদয়কে কঠোর করে ফেলা নয়।
ভুল সংশোধনে কোমলতা ও শিক্ষাদানের ভারসাম্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) ভুলের চিকিৎসা শুধু ধমক বা অপমানের মাধ্যমে করতেন না; বরং তিনি বুঝতেন, শিক্ষা দিতেন এবং সংশোধন করতেন। একবার এক গ্রাম্য ব্যক্তি মসজিদের মধ্যে প্রস্রাব করে ফেলল। সাহাবিরা তাকে বাধা দিতে এগিয়ে গেলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তাকে ছেড়ে দাও।’
তারপর সেখানে এক বালতি পানি ঢেলে দিতে বললেন এবং বললেন, ‘তোমাদের তো সহজকারী হিসেবে পাঠানো হয়েছে, কঠিনকারী হিসেবে পাঠানো হয়নি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২২০)
এখান থেকে বোঝা যায়, ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা প্রথমে অপরাধীকে অপমান করে না; বরং ভুলের কারণ বোঝে, সংশোধন করে এবং তার মর্যাদা রক্ষা করে।
দুঃখ ও আনন্দের অনুভূতিতে ভারসাম্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর পুত্র ইবরাহিমের মৃত্যুর সময় কেঁদেছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘চোখ অশ্রুসিক্ত হয়, হৃদয় দুঃখিত হয়; কিন্তু আমরা এমন কোনো কথা বলি না যা আমাদের রবকে অসন্তুষ্ট করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৩০৩)
এখানে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য দেখা যায়। ইসলাম মানুষের অনুভূতিকে হত্যা করে না; বরং অনুভূতিকে ঈমানের সীমার মধ্যে পরিচালিত ও পরিশুদ্ধ করে। দুঃখ থাকবে, কান্না থাকবে, কিন্তু হতাশা নয়। আনন্দ থাকবে, কিন্তু গাফিলত নয়।
পরিবারে ভালোবাসা, ন্যায় ও দায়িত্বের ভারসাম্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর পরিবারের সঙ্গে অত্যন্ত কোমল ও ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তিনি ঘরের কাজে পরিবারের সদস্যদের সাহায্য করতেন। আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘরে কী করতেন?
তিনি বললেন, ‘তিনি তাঁর পরিবারের কাজে ব্যস্ত থাকতেন/পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪৮৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) স্ত্রীদের অধিকার রক্ষা করতেন এবং তাঁদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতেন।
এ থেকে বোঝা যায়, পারিবারিক ভারসাম্য শুধু সুন্দর বক্তৃতার বিষয় নয়; বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট দায়িত্ব, ভালোবাসা, সহযোগিতা ও ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে তা গড়ে ওঠে।
নেতৃত্বে সাহস ও পরিকল্পনার ভারসাম্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন অত্যন্ত সাহসী, কিন্তু কখনো বেপরোয়া ছিলেন না। তিনি আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও উপায় অবলম্বন করতেন। মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের ঘটনাটি এর সুন্দর উদাহরণ। তিনি উপযুক্ত সঙ্গী নির্বাচন করেছিলেন, দুটি উট প্রস্তুত করেছিলেন, প্রচলিত পথের পরিবর্তে ভিন্ন পথ অবলম্বন করেছিলেন, গুহায় অবস্থান করেছিলেন, একজন দক্ষ পথ প্রদর্শকের সহায়তা নিয়েছিলেন।
অর্থাৎ, তিনি যথাসম্ভব পরিকল্পনা ও উপায় অবলম্বন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর হৃদয় ছিল আল্লাহর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। গুহায় যখন আবু বকর (রা.) উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলেন, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন—‘চিন্তা কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা : আত-তাওবা, আয়াত : ৪০)
এমআর




Comments