Image description

২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর পেরিয়ে গেছে ছয় মাস। শুরুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের বেশি চলবে না বলে ধারণা দিয়েছিলেন। কিন্তু সংঘাত থামেনি। বরং এর বিস্তার ঘটেছে হরমুজ প্রণালী থেকে ক্যাসপিয়ান সাগর পর্যন্ত।

এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত আনুমানিক ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন আরও কয়েক হাজার। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের ছয় মাস পর প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আসলে কতটা নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে।

আল জাজিরার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে থাকলেও যুদ্ধের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ফলাফল একতরফা নয়। ইরানও বড় ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে, কিন্তু এখনো তার রাজনৈতিক কাঠামো টিকে আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম বড় লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ঠেকানো। দেশটির পারমাণবিক স্থাপনায় একের পর এক হামলা চালানো হলেও ইরানের কাছে এখনো প্রায় ৪৪০ কেজি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল এই মজুত হস্তান্তর এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ হোক। তেহরান তাতে রাজি হয়নি।

জুনে দুই পক্ষ একটি সমঝোতায় পৌঁছালেও সেটি বেশিদিন টেকেনি। সমঝোতার ভাষা নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় সেটি ভেঙে পড়ে। ফলে পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার মার্কিন লক্ষ্যও এখনো নিশ্চিত হয়নি।

ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করাও ওয়াশিংটনের আলোচনায় ছিল। যুদ্ধের প্রথম দিন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। কিন্তু তাঁর পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেন। অর্থাৎ নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটলেও ইরানের রাজনৈতিক কাঠামোর মৌলিক পরিবর্তন হয়নি।

ইরানের আঞ্চলিক মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর প্রভাব কমানোও যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু হিজবুল্লাহ, হুথি ও অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। এই দাবিটিও যুদ্ধের সমঝোতায় স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংসের লক্ষ্যেও ব্যাপক হামলা চালানো হয়েছে। ট্রাম্পের দাবি, ইরানের প্রায় ৮২ শতাংশ ক্ষেপণাস্ত্র নষ্ট হয়েছে। দেশটির নৌবাহিনীও বড় ধরনের আঘাত পেয়েছে। তবে ইরান এখনো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে সক্ষম। জুলাইয়ে একটি দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় জর্ডানে তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরানের তেল খাত নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যও পূরণ হয়নি। ট্রাম্প ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেলকেন্দ্র খার্গ দ্বীপ নিয়ন্ত্রণের কথা বললেও এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কোনো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেয়নি।

অন্যদিকে হরমুজ প্রণালী হয়ে উঠেছে এই যুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ক্ষেত্র। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান কার্যত এই জলপথে চলাচল বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন যেখানে শতাধিক জাহাজ চলাচল করত, সেখানে সংখ্যা নেমে এসেছে গড়ে প্রায় পাঁচটিতে।

ইরানের এই পদক্ষেপের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি তেল ও গ্যাস পরিবহন হতো। ফলে জলপথটিতে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও বড় প্রভাব পড়েছে।

অর্থনীতিতে ইরান সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধে দেশটির রিয়ালের মূল্য ব্যাপকভাবে কমে গেছে। খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে এবং তেল রপ্তানি থেকে আয় কমেছে। মার্কিন অবরোধের কারণে ইরানের তেল আয়ে অন্তত ৬ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি হয়েছে বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে সংকটের মধ্যেও তেহরান চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছে। চীন নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করলেও সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েনি। রাশিয়ার সঙ্গেও ইরানের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রও যুদ্ধের মূল্য দিচ্ছে। তেলের দাম বাড়ায় মার্কিন ভোক্তাদের ওপর চাপ বেড়েছে। জুলাইয়ের এক জরিপে দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রভাব আগামী নভেম্বরে রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

মিত্রদের ক্ষেত্রেও ওয়াশিংটন প্রত্যাশিত সমর্থন পায়নি। ন্যাটোর অনেক দেশ সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। স্পেন, ইতালি ও জার্মানি যুদ্ধের সমালোচনা করেছে। ফ্রান্সও অবরোধ কার্যকরে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে। এশিয়ার জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়াও যুদ্ধে জড়ায়নি।

ইরানের জন্যও আঞ্চলিক সম্পর্ক সহজ হয়নি। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, ইরাক, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইনের বিভিন্ন স্থাপনায় ইরান হামলা করেছে। এসব দেশ ইরানের হামলাকে নিজেদের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখেছে।

সামরিক ক্ষতির দিক থেকে ইরানের ক্ষতি বেশি। একাধিক সামরিক ঘাঁটি ও পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস হয়েছে। তবে দেশটির সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি অচল হয়ে যায়নি। শাহেদ ড্রোনের মতো তুলনামূলক সস্তা অস্ত্রের উৎপাদন ও ব্যবহারও অব্যাহত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রেরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধে ১৮ মার্কিন সেনা নিহত এবং ৭৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে কিছু অত্যাধুনিক অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এগুলো বছরে সীমিতসংখ্যায় উৎপাদিত হয় এবং প্রতিটির দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার।

এই ঘাটতি পূরণে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। আগস্টে রেথিয়নের সঙ্গে ২২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করা হয়েছে। এর লক্ষ্য টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বছরে ৬০ থেকে বাড়িয়ে এক হাজারের বেশি করা।

তাহলে এই যুদ্ধে জয়ী কে

বিশ্লেষকদের মতে, এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো বিজয়ী নেই। যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ইরানের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানতে সক্ষম হলেও রাজনৈতিক ও কৌশলগত সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।

অন্যদিকে ইরান টিকে থাকার ক্ষেত্রে সফল হলেও যুদ্ধের মূল্য দিয়েছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষতির মাধ্যমে। দেশটির পারমাণবিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কমেছে এবং অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়েছে।

অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইরান বিশেষজ্ঞ আলাম সালেহর মতে, যুক্তরাষ্ট্র সুপারপাওয়ার হয়েও সামরিক সাফল্যকে বাস্তব রাজনৈতিক অর্জনে রূপ দিতে পারেনি। তবে ইরান টিকে আছে বলেই তাকে এই যুদ্ধে বিজয়ী বলা যায় না।

অর্থাৎ ছয় মাসের এই যুদ্ধে দুই পক্ষই বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক সক্ষমতার প্রভাব দেখিয়েছে, কিন্তু সব লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। ইরানও ধ্বংসের মুখে পড়েও টিকে আছে, তবে তার অর্থনীতি, সামরিক শক্তি ও আঞ্চলিক অবস্থান আগের তুলনায় অনেক বেশি চাপে।

সূত্র: আল জাজিরা
এমআর