ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার সন্তোষপুর এলাকায় প্রস্তাবিত ইকোপার্ক ঘিরে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। একদিকে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠলে কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের সম্ভাবনা দেখছেন অনেকে। অন্যদিকে ইকোপার্ক নির্মাণের জন্য কৃষিজমি ব্যবহার করা হলে জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন স্থানীয় কৃষকরা। আবাদি জমি ও বসতভিটা রক্ষার দাবি জানিয়ে ইতোমধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) ফুলবাড়িয়ার সন্তোষপুর এলাকার কৃষক, দোকানদার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সন্তোষপুর এলাকায় প্রায় ৫৬৫ একর জমিতে ইকোপার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৫১৫ একর জমি স্থানীয় কৃষকদের দখলে রয়েছে বলে দাবি তাদের। এসব জমিতে কৃষকরা বিভিন্ন জাতের গাছের চারা, কলা, হলুদ, আনারস, আদা এবং বিভিন্ন ফলদ ও ঔষধি গাছ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাদের অনেকেই সরকারের শেয়ার হিসেবে এসব জমিতে কাজ করছেন।
স্থানীয় প্রবীণ কৃষক রইছ উদ্দিন বলেন, পুরুষানুক্রমে এই জমিতে চাষাবাদ করে তারা জীবিকা নির্বাহ করছেন। ধান, পাট ও বিভিন্ন সবজি চাষ করে পরিবারের খরচ চালাতে হয়। ইকোপার্ক নির্মাণের জন্য এসব জমি অধিগ্রহণ করা হলে তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। তার দাবি, শুধু ক্ষতিপূরণ দিয়ে হারানো জীবিকা ও দীর্ঘদিনের বসতভিটার ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, তাদের বিলাসিতার কোনো পার্ক প্রয়োজন নেই; আবাদি জমি ও জীবিকার অধিকার রক্ষা করাই তাদের প্রধান দাবি।
চাষি রহমত আলী বলেন, কৃষিনির্ভর এই এলাকায় আবাদি জমি নষ্ট করে ইকোপার্ক নির্মাণ করা হলে স্থানীয় মানুষের ক্ষতি হবে। তার মতে, পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের আগে স্থানীয় কৃষকদের জীবিকা ও গ্রামীণ অর্থনীতির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিন বিঘা জমিতে সবজি চাষ করে সংসার চালান প্রান্তিক কৃষক সলিমুল্লাহ। তিনি বলেন, মৌসুম শেষে ফসল বিক্রির টাকা দিয়ে মেয়ের পড়াশোনা ও পরিবারের চিকিৎসার খরচ চালাতে হয়। আবাদি জমি পার্কের জন্য ব্যবহার করা হলে তাদের মতো কৃষকদের পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে। তাই উন্নয়ন হলেও তা যেন কৃষকের জীবিকা নষ্ট করে না হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
বর্গাচাষি আব্দুল মালেক বলেন, অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষ করে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে হয়। জমি অধিগ্রহণ করা হলে জমির মালিক হয়তো ক্ষতিপূরণ পাবেন, কিন্তু তাদের মতো বর্গাচাষিদের কী হবে—এ প্রশ্নের উত্তর নেই। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বর্গাচাষিদের ভবিষ্যৎ নিয়েও পরিকল্পনা করার দাবি জানান তিনি।
তরুণ কৃষক খোরশেদ আলম বলেন, এলাকার অনেক তরুণ কৃষিকাজের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। তাদের মতে, কৃষিজমি নষ্ট করে কর্মসংস্থান তৈরির চেয়ে কৃষিকে কেন্দ্র করেই নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। যে জমি তাদের অন্ন জোগায়, সেই জমি রক্ষায় তারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন বলেও জানান তিনি।
তবে স্থানীয় সচেতন নাগরিক মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম শফিক ইকোপার্ক নির্মাণের পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, একটি পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়বে এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। এতে ফুলবাড়িয়ার অর্থনৈতিক গুরুত্বও বাড়তে পারে। অতীতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে বিরোধিতার কারণে সুযোগ হারানোর উদাহরণ তুলে ধরে তিনি ইকোপার্ক প্রকল্প বাতিল না করে যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
এদিকে ইকোপার্ক নির্মাণের সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, উন্নয়নের নামে উর্বর কৃষিজমি অকৃষি কাজে ব্যবহার করা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। কোনো এলাকায় প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য, জলাশয় ও কৃষিজমির মধ্যে যে ভারসাম্য রয়েছে, তা নষ্ট হলে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তিনি বলেন, কৃত্রিমভাবে গড়ে তোলা পর্যটনকেন্দ্র প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের পুরোপুরি বিকল্প হতে পারে না। তাই প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
কৃষকদের উদ্বেগ ও পরিবেশগত বিষয় নিয়ে ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) কাজী মুহাম্মদ নূরুল করিম বলেন, কৃষক বা স্থানীয় বাসিন্দাদের আতঙ্কিত হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। ইকোপার্ক প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য এলাকার প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ইকোট্যুরিজমের মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা। বর্তমানে প্রকল্পের প্রাথমিক রূপরেখা তৈরির কাজ চলছে। তিনি বলেন, কোনো উর্বর কৃষিজমি বা কৃষকের বসতবাড়ি উচ্ছেদ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেই। ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রেখেই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
তবে প্রশাসনের আশ্বাসের পরও স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ কাটেনি। তাদের দাবি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কৃষিজমি, কৃষকের জীবিকা ও পরিবেশ—তিনটি বিষয়কেই সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের আশঙ্কা, প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে আবাদি জমি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে দীর্ঘমেয়াদে স্থানীয় অর্থনীতি ও কৃষিনির্ভর পরিবারগুলো সমস্যায় পড়বে।
স্থানীয়দের একাংশের মতে, পর্যটন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে হলে এমনভাবে ইকোপার্কের পরিকল্পনা করা প্রয়োজন, যাতে কৃষিজমি ও কৃষকের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। অন্যদিকে প্রকল্পের পক্ষের মানুষজন বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইকোপার্ক হলে এটি ফুলবাড়িয়ায় নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। ফলে কৃষকস্বার্থ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় করেই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দাবি উঠেছে।
এসএ




Comments