প্লুটোর গ্রহত্ব বাতিলের দুই দশক পূর্তিতে সৌরজগতের এই সাবেক সদস্যকে ঘিরে বিতর্ক নতুন করে তুঙ্গে উঠেছে। ২০০৬ সালের আগস্টে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়নের (আইএইউ) এক ঐতিহাসিক ভোটাভুটিতে প্লুটোকে মূল গ্রহের তালিকা থেকে নামিয়ে ‘বামন গ্রহ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যার ফলে আমাদের সৌরজগতের গ্রহের সংখ্যা নয় থেকে কমে আটে দাঁড়ায়।
কিন্তু দীর্ঘ ২০ বছর পর এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা এখন আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। স্টিফেন ডাব্লিউ হকিং সেন্টার ফর মাইক্রোগ্র্যাভিটি রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশনের পরিচালক ফিলিপ মেটজগার ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ২০০৬ সালে তারা গ্রহের যে সংজ্ঞা তৈরি করেছিল, তা বিজ্ঞানে একেবারেই অনুপযোগী এবং এটি বিজ্ঞানচর্চায় ব্যবহার করার মতো কোনো কাজের সংজ্ঞাই নয়।
অনেক গবেষক ও সাধারণ মানুষের কাছে প্লুটোর এই অবনমন শুধুই একটি বৈজ্ঞানিক শ্রেণিবিন্যাস নয় বরং অন্যায়ের শিকার হওয়া কোনো দুর্বল সত্তার প্রতি সংহতি প্রকাশের মতো। লোয়েল অবজারভেটরির ইতিহাসবিদ কেভিন শিন্ডলারের মতে, প্লুটো যেন সেই ছোট বাচ্চাটির মতো, যাকে সবাই মিলে ক্রমাগত হয়রানি করছে, আর তাই মানুষ এর পক্ষে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। লেখক ও অনিয়মিত জ্যোতির্বিজ্ঞানী লরেল কর্নফেল্ড জানিয়েছেন, ভোটের দিন থেকেই তিনি প্রতিবাদে নেমেছিলেন এবং দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এই লড়াই তিনি অব্যাহত রেখেছেন। প্রথম দিকে এটি শুধু বিজ্ঞানীদের তর্ক মনে হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রচারণা একটি জনপ্রিয় আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রতিনিধিরা পর্যন্ত বিষয়টি পুনর্মূল্যায়নের পক্ষে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন এবং এই সংক্রান্ত বিতর্ক পুনরায় শুরু করার আবেদন জানাচ্ছেন।
পুরো বিতর্কের সূচনা হয়েছিল ২০০৫ সালে যখন নেপচুনের ওপারে কাইপার বেল্টে এরিস নামের এক মহাজাগতিক বস্তু আবিষ্কৃত হয়। এরিস আকারে প্লুটোর কাছাকাছি হওয়ায় প্রশ্ন ওঠে, যদি প্লুটো গ্রহ হয় তবে এরিস কেন নয়। শুধু এরিস নয়, সেডনা বা হাউমিয়ার মতো আরও বহু বস্তু আবিষ্কৃত হওয়ায় সৌরজগতে শত শত গ্রহ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই জটিলতা কাটাতে আইএইউ তিনটি শর্তসাপেক্ষে গ্রহের নতুন সংজ্ঞা ঘোষণা করে: বস্তুকে সূর্যের চারদিকে ঘুরতে হবে, গোল আকার ধারণের মতো পর্যাপ্ত ভর থাকতে হবে এবং নিজের কক্ষপথের আশপাশের এলাকা পরিষ্কার বা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শেষ শর্তটি পূরণ করতে না পারায় বাদ পড়ে যায় প্লুটো। কিন্তু কর্নফেল্ড ও মেটজগারের মতো বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি একটি পক্ষপাতদুষ্ট সংজ্ঞা, কারণ একটি বস্তুর কক্ষপথ পরিষ্কার করার ক্ষমতা নির্ভর করে তার অবস্থানের ওপর। একই বস্তু অন্য জায়গায় থাকলে গ্রহ বলে গণ্য হতো, যা বিজ্ঞানসম্মত নয়।
নিউ হরাইজন্স মহাকাশযান ২০১৫ সালে যখন প্লুটোর পাশ দিয়ে যায়, তখন ভূ-পদার্থবিজ্ঞানীরা দেখেন যে প্লুটোয় পর্বত, বরফের নদী এবং জটিল ভূতাত্ত্বিক সক্রিয়তা রয়েছে, যা একে গ্রহের মর্যাদা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। বিপরীত পক্ষে গতিবিজ্ঞানীরা কক্ষপথীয় নিয়ন্ত্রণকে প্রধান্য দেন। মাইক ব্রাউন, যাকে প্লুটোর অন্যতম হত্যাকারী বলা হয়, তিনি তর্ক তোলেন যে অরবিটাল শর্ত বাদ দিলে আমাদের চাঁদকেও গ্রহ বলতে হয়। উত্তরে পল বার্নের মতো বিজ্ঞানীরা বলছেন, চাঁদ একই সাথে উপগ্রহ এবং গ্রহ দুটিই হতে পারে, এতে কোনো বৈজ্ঞানিক বাধা নেই। শেষ পর্যন্ত ভোটাভুটির এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ভুল আখ্যা দিয়ে মেটজগার মন্তব্য করেন, ভোটাভুটি করে মহাজাগতিক সত্য নির্ধারণের এই ভুল সিদ্ধান্ত ছেড়ে বিজ্ঞানীদের আবার আসল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির দিকেই ফিরে যাওয়া উচিত।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এমআর




Comments