তেরখাদায় শতাধিক বাড়িঘর ভাঙচুর-লুটপাটের অভিযোগ
চার মাস ধরে ঘরছাড়া শতাধিক পরিবার, পাল্টাপাল্টি মামলায় উত্তেজনা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক ও নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার জেরে খুলনার তেরখাদা উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মী-সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ সংঘর্ষের জেরে বিএনপির শতাধিক নেতাকর্মীর বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। হামলার আতঙ্কে শতাধিক পরিবারের নারী-পুরুষ গত চার মাস ধরে ঘরবাড়ি ছেড়ে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন বলে অভিযোগ করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, প্রায় ৪০০ বিঘা জমির ইরি মৌসুমের ধান কাটা, বাড়িঘর থেকে গরু-ছাগল ও মূল্যবান মালামাল লুটের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনায় তাদের প্রায় ২০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। স্থানীয় থানা পুলিশকে বিষয়টি জানালেও যথাযথ প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
রোববার (৩০ আগস্ট) বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তেরখাদা উপজেলার মধুপুর ইউনিয়নের মধুপুর গ্রামে সরেজমিনে ঘুরে বিভিন্ন বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাটের চিত্র দেখা যায়। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক বাড়ির দরজা-জানালা, টিনের চাল, আসবাবপত্র ও নির্মাণাধীন ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে নেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও ঘরের ইট, কাঠ ও অন্যান্য সামগ্রীও নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে মধুপুর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ ইদ্রিস মোল্লা, নির্বাচনী সেন্টার কমিটির সদস্য সচিব মো. সাইফুল মোল্লা, ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আনার মোল্লা, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. জাকির শেখ, ওয়ার্ড যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মো. জাকারিয়া মোল্লা, ইউনিয়ন উলামা দলের সভাপতি রফিকুল মোল্লা, মৎস্যজীবী দলের সভাপতি মো. কামরুল শেখ এবং শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. রবি শেখসহ আরও অনেকে রয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টার দিকে মধুপুর আইড়ো খালের বীজের পাশে আল মামুন মোল্লার ওপর পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে তার শরীরের নিচের অংশ পুড়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি (এনআইবিপিএস) হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১ মার্চ আল মামুন মোল্লা মারা যান।
এ ঘটনায় নিহতের চাচাতো ভাই বাদী হয়ে মধুপুর ইউনিয়ন জামায়াতের আমির শাহাজাহান শিকদার ও দাউদ মোল্লাসহ ৪৪ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জনকে আসামি করে তেরখাদা থানায় মামলা করেন।
পরবর্তী সময়ে গত ২৫ এপ্রিল সকালে ধান কাটতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর মধুপুর গ্রামের আট পাকিয়া খালের মাথায় নূরে আলম শেখকে কুপিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগ ওঠে। তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ওই দিন দুপুর ১টার দিকে তিনি মারা যান।
এ ঘটনায় নূরে আলমের ছেলে গোলাম মোস্তফা শেখ বাদী হয়ে ২৭ এপ্রিল সাবেক তেরখাদা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক মধুপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শহিদুল ইসলাম মোল্লাকে প্রধান আসামি করে ৪১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১২ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
এরপর থেকেই মধুপুর গ্রামে দফায় দফায় বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, আল মামুন মোল্লার মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলার জের ধরে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। পরে নূরে আলম হত্যার ঘটনায় তাদের পক্ষের লোকজনকে আসামি করে মামলা দেওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
তাদের দাবি, কয়েক দফায় হামলা চালিয়ে বাড়িঘর ভাঙচুরের পাশাপাশি টাকা, স্বর্ণালংকার, আসবাবপত্র ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নেওয়া হয়েছে। হামলার আশঙ্কায় শতাধিক পরিবারের নারী-পুরুষ প্রায় চার মাস ধরে বাড়িঘরে ফিরতে পারছেন না। কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, আবার কেউ অন্য গ্রামে অবস্থান করছেন।
তেরখাদা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (তদন্ত) মো. তহিদুল ইসলাম বলেন, গত ২৫ এপ্রিল স্থানীয় বিরোধের জেরে নূরে আলম গুরুতর আহত হন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান। এরপর নূরে আলমের পক্ষের লোকজন বাড়িঘরে ভাঙচুর চালান। তিনি তেরখাদায় যোগ দেওয়ার আগের ঘটনা এটি। দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনো ঘটনার খবর পেলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেয়।
খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, তিনি খুলনায় যোগ দেওয়ার পর তেরখাদার মধুপুর গ্রামের ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে তেরখাদা থানা পুলিশকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতির সমাধানের চেষ্টা করা হবে।
এসএ




Comments