Image description

হাটের জায়গা দখল করে বিভিন্ন ধরনের ঘর নির্মাণ

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বানেশ্বর হাটে অবৈধ দখলদারদের দৌরাত্ম্য ও হাটের জায়গা দখলের প্রতিযোগিতায় সাধারণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ আমের হাট ও উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই হাটে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ফুটপাত ও হাটের জায়গা দখলের প্রতিযোগিতা চলছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বণিক সমিতির নির্বাচন না হওয়ায় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় জবাবদিহিমূলক কোনো অভিভাবক নেই বললেই চলে।

সরেজমিনে বানেশ্বর হাট ঘুরে দেখা গেছে, ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক ও সড়কের পাশের ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে স্থায়ী ও অস্থায়ী শতাধিক দোকানপাট। এ ছাড়া হাটের জায়গার বিভিন্ন অংশ স্থানীয় কিছু সুবিধাবাদী মহল ও অসাধু ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়ায় দখল করে পাকা স্থাপনা ও স্থায়ী দোকানঘর নির্মাণ করা হয়েছে।

এতে একদিকে যেমন হাটের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে দিন দিন বাড়ছে যানজট। বিশেষ করে হাটের দিনগুলোতে পণ্য লোড-আনলোড, ক্রেতা-বিক্রেতা ও সাধারণ মানুষের চলাচলে মারাত্মক যানজটের সৃষ্টি হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, কিছু সুবিধাবাদী ব্যক্তি ফুটপাত ও হাটের জায়গা দখল করে দৈনিক ও সাপ্তাহিক ভিত্তিতে চুক্তির মাধ্যমে টাকা আদায় করেন। টাকা না দিলে ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়।

অভিযোগ রয়েছে, এসব সুবিধাবাদী ব্যক্তির কারও কারও নামে পাঁচ থেকে সাতটি পর্যন্ত জায়গা দখল করা রয়েছে। তারা সাপ্তাহিক বা হাটভিত্তিক চুক্তিতে এসব জায়গা থেকে টাকা আদায় করেন বলেও অভিযোগ ব্যবসায়ীদের।

একাধিক ব্যবসায়ীর দাবি, হাট ইজারাদার বা বণিক সমিতির প্রত্যয়নের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের জন্য জায়গা বরাদ্দ থাকা উচিত। কেউ জায়গা নিলে প্রত্যয়ন দেখে ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়া হলে এ ধরনের অনিয়ম ও প্রতারণা কমবে। ব্যবসায়ীরা আরও অভিযোগ করেন, একই জায়গা একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করার ঘটনাও ঘটেছে। এতে কেউ কেউ প্রতারিত হয়েছেন।

অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে বণিক সমিতির নির্বাচন না হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।

বানেশ্বর বণিক সমিতি ১৯৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও ২০১২ সালের পর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। এরপর ক্ষমতাসীন দলের একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে সমিতি পরিচালিত হয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে কার্যকর জবাবদিহিতা না থাকায় বণিক সমিতির প্রতি ব্যবসায়ীদের আস্থা দিন দিন কমে গেছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নির্বাচন না হওয়ায় বর্তমানে অকার্যকর বা পকেট কমিটির মাধ্যমে নামকাওয়াস্তে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে ১৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হলেও সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগের ঘাটতি ও অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের কারণে সেটিও কার্যত অকার্যকর হয়ে আছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান।

এদিকে মাছ, মাংস ও মুরগিপট্টিতে ময়লা-আবর্জনা নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজার ও হাটের ব্যবসায়ীদের ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে অবিলম্বে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা হোক। নতুন নেতৃত্বে তরুণ ও সাধারণ ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে যোগ্য নেতৃত্বের মাধ্যমে বণিক সমিতি পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

বানেশ্বর হাটের ইজারাদার রাসেল সরকার বলেন, “হাটের জায়গা দখল ও পাকা করার বিষয়ে আমরা আগেও অনেকবার উপজেলা প্রশাসনকে জানিয়েছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান চালিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও দখল পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। হাটের বেশিরভাগ জায়গাই দখল হয়ে গেছে। এ বিষয়ে আমরা অনেকটাই নিরুপায়।”

বানেশ্বর বণিক সমিতির সাবেক একাধিকবারের সভাপতি আজিজুল বারী মুক্তা বলেন, “বানেশ্বর বণিক সমিতির কোনো রেজিস্ট্রেশন নেই এবং সরকারি কোনো সংশ্লিষ্টতাও নেই। বাজারের ব্যবসায়ীরা চাইলে নির্বাচন হতে পারে। অধিকাংশ ব্যবসায়ীই নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত জনগণের চাহিদা অনুযায়ী ভোটের ব্যবস্থা করা।”

এ বিষয়ে পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিয়াকত সালমান বলেন, “হাটের অবৈধ জায়গা দখলের বিষয়টি আমার জানা নেই। যদি এমনটা হয়ে থাকে, তাহলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি বানেশ্বর হাট বণিক সমিতির অনিয়ম দূর করে নতুন নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

পরিশেষে, বানেশ্বর হাটের ঐতিহ্য ও প্রশাসনিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু বণিক সমিতির নির্বাচন আয়োজন এখন সময়ের দাবি। সাধারণ ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে হাটে একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ ফিরিয়ে আনবে।

এসএ