উপমহাদেশের আলেম সমাজ
মিম্বর থেকে ক্ষমতার দরবার, আদর্শের এই আপস কতদিন ?
ইসলামের ইতিহাসে আলেম সমাজ কেবল ধর্মীয় বিধিবিধানের শিক্ষক ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন সমাজের বিবেক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কণ্ঠ এবং জনগণের নৈতিক পথপ্রদর্শক। কিন্তু ইতিহাসের পাতা উল্টালে একই সঙ্গে দেখা যায়, ধর্মীয় নেতৃত্ব যখন ক্ষমতার খুব কাছাকাছি চলে যায়, তখন তার সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসে। সত্যের পক্ষে থাকা, নাকি ক্ষমতার সঙ্গে আপস করা—এই দ্বন্দ্ব যুগে যুগে আলেম সমাজকে মোকাবিলা করতে হয়েছে।
আজ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেই পুরোনো প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এসেছে।
সালাহউদ্দিন আইয়ুবী (১১৩৭/৩৮–১১৯৩) মধ্যযুগের অন্যতম আলোচিত মুসলিম শাসক। ১১৭৪ সালে দামেস্কের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে মিসর ও সিরিয়ার বিভিন্ন মুসলিম ভূখণ্ডকে ঐক্যবদ্ধ করেন। ৪ জুলাই ১১৮৭ হিত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডার বাহিনীকে পরাজিত করার পর ২ অক্টোবর ১১৮৭ তিনি জেরুজালেম পুনর্দখল করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় শিক্ষা ছিল—বিভক্ত মুসলিম শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং বৃহত্তর লক্ষ্যকে ব্যক্তিগত ও আঞ্চলিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া।
তাঁকে নিয়ে প্রচলিত নানা কাহিনির মধ্যে ‘তিন হাজার আলেম হত্যার’ দাবিও শোনা যায়। কিন্তু নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সূত্রে এ দাবির সুস্পষ্ট ভিত্তি পাওয়া যায় না। ইতিহাসকে রাজনৈতিক বক্তব্যের হাতিয়ার বানাতে হলে প্রথম শর্তই হলো সত্যনিষ্ঠা। তাই প্রমাণহীন কোনো সংখ্যা বা অভিযোগকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা উচিত নয়।
কিন্তু সালাহউদ্দিনের প্রসঙ্গ থেকে যে প্রশ্নটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেটি হলো, একজন নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন কি তার বক্তব্যে, নাকি তার সিদ্ধান্ত ও অবস্থানে?
এই প্রশ্ন আজ বাংলাদেশের আলেম সমাজের প্রতিও প্রযোজ্য।
মিম্বরের কথা আর রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে দূরত্ব কেন?
উপমহাদেশের ইসলামী চিন্তার ইতিহাস দীর্ঘ ও বৈচিত্র্যময়। ১৮৬৬/১৮৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত দারুল উলূম দেওবন্দ মুসলিম শিক্ষার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আবির্ভূত হয়। পরবর্তী সময়ে দেওবন্দি আলেমদের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, পাকিস্তান আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে ওঠে। অর্থাৎ একই ধর্মীয় ঐতিহ্যের মানুষও রাজনৈতিকভাবে অভিন্ন ছিলেন না।
বাংলাদেশেও দেওবন্দি, কওমি, পীর-মাশায়েখ ও বিভিন্ন ইসলামী ধারার মধ্যে রাজনৈতিক অবস্থানের ব্যাপক বৈচিত্র্য রয়েছে। তাই কোনো নির্দিষ্ট মাদরাসা, খানকা বা দরবারের সব ব্যক্তিকে একই রাজনৈতিক চরিত্রের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন ঐতিহাসিকভাবে যথার্থ নয়, তেমনি রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে কাউকে ‘মুনাফিক’বা ‘ইসলামের শত্রু’ ঘোষণা করাও ন্যায়সংগত নয়।
তবে প্রশ্ন করার অধিকার জনগণের রয়েছে।
যারা মিম্বরে ইসলামের কথা বলেন, রাষ্ট্র ও রাজনীতির প্রশ্নে তাঁদের অবস্থান কি সেই ইসলামী নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
হেফাজত: সংঘাত থেকে সমঝোতার রাজনীতি
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে হেফাজতে ইসলাম একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে তাদের বড় সমাবেশ ও পরবর্তী সংঘর্ষ বাংলাদেশের রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। সেই সময় সরকার ও হেফাজতের সম্পর্ক ছিল তীব্র বিরোধপূর্ণ। কিন্তু রাজনীতির গতিপথ দ্রুত পরিবর্তিত হয়।
পরবর্তী বছরগুলোতে সরকার ও হেফাজতের নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগ ও সমঝোতার নানা দৃষ্টান্ত দেখা যায়। ২০১৭ সালে হেফাজতের দাবির প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে ভাস্কর্য অপসারণের ঘটনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। আবার ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে হেফাজতের শীর্ষ নেতৃত্বের একটি অংশ আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থনের অবস্থান নেয়। এখানেই সাধারণ মানুষের প্রশ্ন।
যে সরকারের বিরুদ্ধে একসময় রাজপথে আন্দোলন করা হয়েছিল, তার সঙ্গেই পরবর্তীতে রাজনৈতিক সমঝোতা—এ পরিবর্তনের নীতিগত ব্যাখ্যা কী?
রাজনীতিতে অবস্থান পরিবর্তন অপরাধ নয়। পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে কৌশলও পরিবর্তিত হতে পারে। কিন্তু ধর্মীয় নেতৃত্বের ক্ষেত্রে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাইবে, এই পরিবর্তন কি আদর্শগত নাকি রাজনৈতিক সুবিধাভিত্তিক?
কারণ আলেমের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত সাধারণ রাজনৈতিক নেতার সিদ্ধান্তের মতো নয়। তাঁর পেছনে থাকে ধর্মীয় বিশ্বাসের নৈতিক কর্তৃত্ব।
পদ-পদবি নাকি আদর্শ—কোনটি বড়?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আমরা প্রায়ই দেখি ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কোনো কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করে। কখনো সরকারি স্বীকৃতি, কখনো প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা, কখনো রাজনৈতিক প্রভাব—এসব বাস্তবতা ধর্মীয় নেতৃত্বের সামনে কঠিন পরীক্ষা তৈরি করে। এখানে মূল প্রশ্ন ক্ষমতার সঙ্গে যোগাযোগ নয়।
ইসলাম কাউকে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে বলে না। বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা তখনই, যখন ক্ষমতার সান্নিধ্য সত্য বলার স্বাধীনতাকে দুর্বল করে দেয়। যে আলেম ক্ষমতাবানের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন না, তিনি সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় কীভাবে নেতৃত্ব দেবেন?
এই প্রশ্নটি শুধু হেফাজতের জন্য নয়; সব ইসলামী সংগঠন, মাদরাসা, খানকা, দরবার ও ধর্মীয় নেতৃত্বের জন্যই প্রযোজ্য।
জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলামী রাজনীতি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় দল ও আলেম সমাজ এসব প্রশ্নে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে।
কেউ ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সমঝোতা করেছেন, কেউ জাতীয়তাবাদকে রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করেছেন, আবার কেউ ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
এখানেও আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোনো একটি শব্দকে কেন্দ্র করে আবেগ সৃষ্টি নয়; বরং কোন রাজনৈতিক দর্শন ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, জবাবদিহি এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারে?
ইসলামের রাজনীতি যদি মানুষের কল্যাণ, ন্যায়বিচার ও আমানতদারির কথা বলে, তাহলে সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগই হওয়া উচিত মূল পরীক্ষা।
শুধু ‘ইসলাম’ শব্দ উচ্চারণ করলেই ইসলামী রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত হয় না।
তরুণ প্রজন্মের প্রশ্নকে অবহেলা করা যাবে না
বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম আগের প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশি প্রশ্নপ্রবণ। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতিহাস পড়ছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ সম্পর্কে জানছে এবং ধর্মীয় বক্তাদের বক্তব্যের সঙ্গে তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থানের তুলনা করছে।
তারা জানতে চাইছে, কেন মসজিদের মিম্বরে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা হবে, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্যায়ের সময় নীরব থাকা হবে?
কেন ইসলামী মূল্যবোধের কথা বলা হবে, কিন্তু দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দখলদারিত্ব ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে একই দৃঢ়তা দেখা যাবে না?
কেন নির্বাচনের সময় ধর্মীয় আবেগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, অথচ জনগণের রাজনৈতিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে আলেম সমাজের কণ্ঠ দুর্বল হয়ে যাবে?
এই প্রশ্নগুলোকে ‘তরুণদের আবেগ’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ ইতিহাসে পরিবর্তনের বড় শক্তি প্রায় সব সময় তরুণরাই হয়েছে।
ভারতীয় আধিপত্যবাদের প্রশ্নেও একই নীতি প্রযোজ্য
বাংলাদেশের তরুণ সমাজের একটি অংশ ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও অসম সম্পর্কের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছে। এই অবস্থানের মধ্যেও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে—দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কোনো দল বা ব্যক্তির সম্পত্তি নয়।
কিন্তু বিদেশি আধিপত্যের বিরোধিতা করার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ অন্যায়ের বিরুদ্ধেও একই নৈতিক অবস্থান থাকতে হবে। বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করব, কিন্তু দেশীয় ক্ষমতাবানের অন্যায়ের সামনে নীরব থাকব—এই দ্বৈতনীতি তরুণ প্রজন্ম মেনে নেবে না। দেশপ্রেম, ইসলাম ও ন্যায়বিচার—তিনটিকেই যদি সত্যিকার অর্থে ধারণ করতে হয়, তবে কোনো শক্তির অন্যায়কেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
ইসলামের উত্থান ঠেকানো যাবে কি?
ইসলামের প্রতি তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ইসলামের উত্থান বলতে আমরা কী বুঝব?
শুধু পোশাকের পরিবর্তন?
শুধু মসজিদে মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি?
শুধু রাজনৈতিক স্লোগান?
নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতা থাকবে, আমানতের প্রতি শ্রদ্ধা থাকবে, বিচারকের কাছে ধনী-গরিব সমান হবে, রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যক্তিগত সম্পত্তি হবে না এবং শাসক জনগণের কাছে জবাবদিহি করবেন?
দ্বিতীয় অর্থে যদি ইসলামের উত্থান ঘটে, তাহলে সেটিকে কোনো রাজনৈতিক কৌশল দিয়ে দীর্ঘদিন আটকে রাখা সম্ভব নয়। কারণ মানুষের ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে চিরদিন দমন করা যায় না।
আজ উপমহাদেশের আলেম সমাজের সামনে একটি ঐতিহাসিক মোড়। তাঁরা কি ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে প্রভাবশালী হওয়ার পথ বেছে নেবেন, নাকি ক্ষমতার বাইরে থেকেও সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে নৈতিক শক্তি হয়ে থাকবেন?
তাঁরা কি রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী অবস্থান পরিবর্তন করবেন, নাকি নীতির প্রশ্নে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী—উভয়ের কাছেই একই সত্য উচ্চারণ করবেন?
তাঁরা কি তরুণদের শুধু বক্তৃতা দেবেন, নাকি নিজেদের কর্ম ও চরিত্র দিয়ে ইসলামের সৌন্দর্য দেখাবেন?
সময় এসেছে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার।
কোনো দরবার, কোনো মাদরাসা, কোনো সংগঠন কিংবা কোনো ব্যক্তিকে শত্রু বানানো এই মুহূর্তের কাজ নয়। বরং প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। কারণ ইসলামী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শত্রু বাইরের কেউ নয়—কথা ও কাজের অমিল, ক্ষমতার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি এবং আদর্শের বিনিময়ে সুবিধা গ্রহণের প্রবণতা। যদি ইসলামের নামে রাজনীতি করতে হয়, তবে প্রথমে ইসলামের ন্যায়নীতি নিজের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যদি তরুণদের ইসলামের দিকে আহ্বান করতে হয়, তবে তাদের সামনে এমন নেতৃত্ব হাজির করতে হবে, যাদের জীবন ক্ষমতার নয়—আদর্শের কাছে মাথা নত করার উদাহরণ।
আর যদি সত্যিই বাংলাদেশে একটি ন্যায়ভিত্তিক ইসলামী জাগরণ আসে, তবে সেটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের একক কৃতিত্ব হবে না; সেটি হবে সত্য, ন্যায়, নৈতিকতা ও জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার সম্মিলিত ফল।
উপমহাদেশের ইতিহাসের শিক্ষা একটাই—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আদর্শের পরীক্ষা চিরস্থায়ী। এখন সিদ্ধান্ত আলেম সমাজের—তাঁরা ইতিহাসের কোন পাশে নিজেদের নাম লিখবেন?
লেখক: ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক
এনএ




Comments