Image description

বাংলাদেশের গ্রামীণ ও নগর সমাজকাঠামোয় বখাটেপনা বা বিচ্যুতির বিষয়টি বর্তমানে একটি অন্যতম প্রধান সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। সমাজবিজ্ঞান, অপরাধবিজ্ঞান এবং সামাজিক মনস্তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এবং সামাজিক অস্থিতিশীলতার পেছনে একদল পথভ্রষ্টব্যক্তির নীতিহীন আচরণ প্রত্যক্ষভাবে দায়ী, যাদের লোকজ ভাষায় ‘বখাটে’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। 

সরকারি হিসাব ও বিভিন্ন সামাজিক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৮৭,৩১৯টি গ্রাম রয়েছে। যদি প্রতিটি গ্রামে গড়ে অন্তত এক ডজন এমন পথভ্রষ্ট ব্যক্তি থাকে, তবে গাণিতিক ও পরিসংখ্যানগত হিসাব অনুযায়ী দেশজুড়ে এই বখাটে জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১০,৪৭,৮২৮ জন (১০ লক্ষ ৪৭ হাজার ৮২৮ জন)। এই বিপুলসংখ্যক অসংগঠিত অথচ নেতিবাচকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠীটি সমাজবিজ্ঞানের ‘ডিফারেনশিয়াল অ্যাসোসিয়েশন’ তত্ত্ব অনুযায়ী জ্যামিতিক হারে নতুন নতুন অপরাধী তৈরি করছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তা বলয়কে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলছে। শ্রমবাজারে এদের কোনো অবদান না থাকায় এরা সমাজকাঠামোর ওপর এক ধরনের পরজীবী হিসেবে জীবনধারণ করে।

অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই উপ-সংস্কৃতির সদস্যরা সমাজে নানাবিধ অপরাধের মূল হোতা হিসেবে কাজ করে। এরা মাদক চোরাচালান, মাদক সেবন ও বিক্রির সিন্ডিকেটের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে এরা নারী নির্যাতন, যৌতুক প্রথাকে উসকে দেয়া, ইভটিজিং বা যৌন হয়রানি এবং জোরপূর্বক বাল্যবিবাহের মতো গুরুতর অপরাধগুলো অত্যন্ত সংগঠিত উপায়ে পরিচালনা করে। সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা যায়, এই বখাটেরা স্থানীয় বিচারিক ব্যবস্থা বা ঐতিহ্যবাহী সালিশ-দরবারকে নিজেদের স্বার্থে অপব্যবহার করে সম্পূর্ণ গ্রামকে জিম্মি করে ফেলে। এরা আইনি প্রক্রিয়া ও সামাজিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে নিজেদের মনগড়া আইন চাপিয়ে দেয়। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় একে ‘সামাজিক অ্যানোমি’ বা নিয়মহীনতা বলা চলে।

মনস্তাত্তি¡ক দ্বিমুখিতা বা ‘ম্যাকিয়াভেলিয়ান’ আচরণের এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো এই বখাটেদের দ্বৈত ভূমিকা। এরা একদিকে চোর বা অপরাধীদের চুরির সুযোগ করে দেয় বা অপরাধ করতে প্ররোচিত করে, অন্যদিকে আবার গৃহস্থ বা সাধারণ গ্রামবাসীকে সচেতন থাকার ভণ্ড অভিনয় দেখায়। এই ধরনের আচরণ সমাজের অভ্যন্তরে এক গভীর পারস্পরিক অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।

এই অপরাধী চক্রটি গ্রামীণ সমাজব্যবস্থায় এক ধরনের ‘মামলা বাণিজ্য’ বা কৃত্রিম আইনি জটিলতা তৈরি করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয়। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এরা গ্রাম্য দলাদলি সৃষ্টি করে এবং নিরীহ মানুষকে মিথ্যা মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি করে। আইনি ব্যবস্থার ফাঁকফোকর এবং স্থানীয় প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এরা এই অনৈতিক বাণিজ্য পরিচালনা করে।

রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞানের নিরিখে, এই গোষ্ঠীর চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে স্থানীয় রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা। এরা হয় নিজেরা কারচুপি, পেশীশক্তি ও কালো টাকা ব্যবহার করে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার বা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়, অথবা ক্ষমতার নেপথ্যে থেকে নির্বাচিত মেম্বার-চেয়ারম্যানদের সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। এর ফলে স্থানীয় সরকারের গণতান্ত্রিক কাঠামোটি ভেঙে পড়ে। ক্ষমতার এই অপব্যবহার ও অপরাধমূলক বলয়ের কারণে এরা গ্রামীণ সমাজে এক একজন ‘স্বঘোষিত সম্রাট’ হিসেবে আবির্ভাব হয়। এদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের কথা বলার বা প্রতিবাদ করার কোনো সাহস থাকে না। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘স্বৈরাচারী উপ-সংস্কৃতি’ বলা যায়, যেখানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা থাকে না এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ এই বখাটেদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

তাত্তি¡কভাবে বিচার করলে, এই বখাটেরাই কালক্রমে গ্রামীণ অঞ্চলের মূল আইনে পরিণত হয়। দেশের প্রচলিত বিচারিক ও প্রশাসনিক আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এদের মুখের কথাই স্থানীয় অধিবাসীদের মানতে বাধ্য করা হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রান্তিক পর্যায়ে আইনি প্রয়োগের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এরা সমান্তরাল একটি শাসনব্যবস্থা কায়েম করে, যা গ্রামীণ সামাজিক চুক্তি ও নাগরিক অধিকারকে সম্পূর্ণ ভূলুণ্ঠিত করে।

এই বখাটে সংস্কৃতির সবচেয়ে বিপজ্জনক বৈজ্ঞানিক দিকটি হলো এর স্বয়ংক্রিয় পুনরুৎপাদন ক্ষমতা। অপরাধবিজ্ঞানের ‘লবণের দলা’ বা ‘ক্রিমিনাল ইনফেকশন’ তত্ত্ব অনুযায়ী, একটি সুনির্দিষ্ট এলাকায় যখন বখাটেদের আধিপত্য থাকে, তখন সেই এলাকার উদীয়মান কিশোর ও তরুণরা তাদের ক্ষমতা ও আড়ম্বর দেখে আকৃষ্ট হয়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব ও উপযুক্ত দিকনির্দেশনার অভাবে নতুন প্রজন্মের তরুণরা খুব সহজেই এই চক্রে শামিল হয়ে নতুন বখাটে হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা এই সমস্যাকে চিরস্থায়ী রূপ দিচ্ছে। এই ১০ লক্ষাধিক বখাটে জনগোষ্ঠীর উৎপাত থেকে সমাজকে রক্ষা করতে হলে সর্বপ্রথম প্রয়োজন আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে প্রতিটি গ্রামে অপরাধীদের একটি বৈজ্ঞানিক ডাটাবেজ বা তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা। স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে এই বখাটেদের গতিবিধি, অপরাধের ইতিহাস এবং আর্থিক উৎসের ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাতে হবে। আইনি ব্যবস্থার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করে এদের রাজনৈতিক ও সামাজিক আশ্রয়-পশ্রয় সম্পূর্ণ বন্ধ করা এই সমস্যার প্রাথমিক ও প্রধান সমাধান।

সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বখাটে সমস্যা দূরীকরণের অন্যতম কার্যকর উপায় হলো গ্রামীণ পর্যায়ে উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বাধ্যতামূলক কারিগরি শিক্ষার প্রসার ঘটানো। এই যুবকদের মনস্তাত্তি¡ক রূপান্তরের জন্য সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করতে হবে। ‘শ্রমের মর্যাদা’ নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে এদের নিষ্ক্রিয় হাতগুলোকে কর্মক্ষম করে তুলতে পারলে অপরাধের হার এবং সমাজ ধ্বংসকারী মানসিকতা অনেকাংশে কমে আসবে যা অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

গ্রামীণ বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং স্থানীয় সরকারের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এই সমস্যা সমাধানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক পথ। চিরাচরিত পক্ষপাতদুষ্ট সালিশি ব্যবস্থার পরিবর্তে আইনি কাঠামোর অধীনে ‘গ্রাম আদালত’ বা ডিজিটাল লিগ্যাল এইড ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে শতভাগ স্বচ্ছ ও পেশীশক্তি মুক্ত করার মাধ্যমে বখাটেদের ক্ষমতার উৎসে আঘাত হানতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করতে না পারে।

অপরাধ দমনে সামাজিক মনস্তত্ত্বের প্রয়োগ ঘটিয়ে প্রতিটি গ্রামীণ কমিউনিটিতে ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ এবং ‘নাগরিক প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। সমাজবিজ্ঞানের ‘কালেক্টিভ এফিকেসি’ বা সম্মিলিত কার্যকারিতা তত্ত্ব অনুযায়ী, যখন সমাজের সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, তখন অপরাধী গোষ্ঠী স্বয়ংক্রিয়ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত উঠান বৈঠক, মাদকবিরোধী সেমিনার এবং অপরাধের কুফল সম্পর্কে গ্রামীণ স্তরে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে।

পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণ এই সামাজিক ব্যাধি দূর করার অন্যতম মনস্তাত্ত্বিক হাতিয়ার। শৈশব থেকেই যেন প্রতিটি শিশু নৈতিক শিক্ষা, জেন্ডার সমতা এবং সহনশীলতার পাঠ পায়, তা নিশ্চিত করতে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। সন্তান কার সাথে মিশছে বা অবসর সময় কীভাবে পার করছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বখাটে সংস্কৃতির নেতিবাচক দিকগুলো পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে কিশোরদের মানসিক গঠনে পরিবর্তন আনা সম্ভব।

মাদক, ইভটিজিং ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় জিরো টলারেন্স নীতি প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বখাটেদের মূল চালিকাশক্তি বা অর্থনৈতিক জ্বালানি হলো মাদক ব্যবসা ও মামলা বাণিজ্য; তাই এই অপরাধের সাথে জড়িতদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইনি প্রক্রিয়ার এই গতিশীলতা ও কঠোরতা বখাটেদের মনে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি তৈরি করবে, যা তাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখতে বাধ্য করবে।

চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক সমাধান হিসেবে অপরাধী সংশোধনমূলক মনস্তাত্তি¡ক থেরাপি এবং রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন কেন্দ্রের সংখ্যা ও মান বৃদ্ধি করতে হবে। যেসব তরুণ বা কিশোর ইতিপূর্বেই বখাটে উপ-সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়েছে, তাদের সমাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন না করে বৈজ্ঞানিক আচরণগত থেরাপির মাধ্যমে মূলধারার সমাজে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত এই সংশোধন কেন্দ্রগুলো অপরাধপ্রবণ যুবকদের মানসিক শুশ্রুষা ও নৈতিক পুনর্গঠনে দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখবে।

পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজকাঠামোকে বখাটে সংস্কৃতির এই বিষাক্ত ছোবল থেকে মুক্ত করা কেবল একটি প্রশাসনিক দায়িত্বই নয়, বরং এটি একটি সুদূরপ্রসারী সামাজিক ও বৈজ্ঞানিক চ্যালেঞ্জ। ১০ লক্ষাধিক ব্যক্তির এই বিশাল পথভ্রষ্ট জনগোষ্ঠীকে সঠিক সময়ে নিয়ন্ত্রণ ও সংশোধন করা না গেলে তা দেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের পথকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি এবং অপরাধবিজ্ঞানের এই সমন্বিত সমাধানগুলো যদি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে সমন্বিতভাবে প্রয়োগ করা যায়, তবেই কেবল গ্রামীণ ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকবে। বখাটেদের স্বঘোষিত সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়ে একটি সাম্যমুখী, নিরাপদ, আইনের শাসনে বিশ্বাসী এবং অপরাধমুক্ত আধুনিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ করা তখনই সম্ভব হবে যখন সমাজ ও রাষ্ট্র এই সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক