Image description

হাসপাতালে রোগী নিয়ে ছুটে আসা স্বজনদের কাছে অ্যাম্বুলেন্স সেবা অনেক সময় হয়ে ওঠে আরেক ভোগান্তির কারণ। জরুরি মুহূর্তের সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, রোগী ও স্বজনদের হয়রানি এবং হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের জট—দীর্ঘদিনের এসব অভিযোগের অবসানে এবার উদ্যোগ নিয়েছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (রামেকহা) কর্তৃপক্ষ। বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবায় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা ফেরাতে হাসপাতাল চত্বরে ‘রামেকহা অ্যাম্বুলেন্স সেন্টার’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এই সেন্টারের মাধ্যমে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) তত্ত্বাবধানে নিবন্ধিত বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ও চালকদের তালিকা তৈরি করা হবে। তালিকাভুক্ত অ্যাম্বুলেন্সগুলো সিরিয়াল অনুযায়ী এবং রোগীর গন্তব্যের দূরত্ব বিবেচনায় নির্ধারিত ও যৌক্তিক ভাড়ায় রোগী পরিবহন ও লাশবাহী গাড়ির সেবা দেবে। এতে রোগী ও স্বজনদের হয়রানি এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের সুযোগ কমার পাশাপাশি হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে যানজটও নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হাসপাতাল-পুলিশ-সিটি করপোরেশনের সমন্বিত উদ্যোগ

রোগীদের পরিবহন ব্যবস্থা আরও সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও রোগীবান্ধব করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, আরএমপি, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এবং বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালকদের প্রতিনিধিদের নিয়ে বিশেষ আলোচনা ও মতবিনিময় সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকাল ১১টায় রামেকহা সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পিকেএম মাসুদ উল ইসলাম। সভা সঞ্চালনা করেন হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. হাসানুল হাছিব।

সভায় উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ এই সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানে রোগী পরিবহনে নিয়োজিত বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী গাড়ির পরিচালনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, রোগীদের হয়রানি ও দুর্ভোগ কমানো এবং জরুরি বিভাগের প্রবেশমুখে যানজট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সিরিয়াল অনুযায়ী অ্যাম্বুলেন্স

সভায় সিদ্ধান্ত হয়, প্রস্তাবিত অ্যাম্বুলেন্স সেন্টারের মাধ্যমে নিবন্ধিত অ্যাম্বুলেন্স ও চালকদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হবে। তালিকাভুক্ত অ্যাম্বুলেন্সগুলো নির্ধারিত সিরিয়াল অনুযায়ী রোগী পরিবহনের সুযোগ পাবে।

পাশাপাশি রোগীর গন্তব্যের দূরত্ব বিবেচনায় যৌক্তিক ভাড়া নির্ধারণের ব্যবস্থা করা হবে। একই ব্যবস্থার আওতায় লাশবাহী গাড়ির সেবাও পরিচালিত হবে। এর ফলে জরুরি মুহূর্তে রোগী বা স্বজনদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো ভাড়া আদায়ের সুযোগ কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জরুরি বিভাগের সামনে যানজট কমানোর লক্ষ্য

রামেকহা ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের অবস্থান ও চলাচল নিয়ে নানা ধরনের সমস্যা দেখা যায়। বিশেষ করে জরুরি বিভাগের প্রবেশমুখে একসঙ্গে অনেক অ্যাম্বুলেন্স অবস্থান করায় যানজট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি রোগী পরিবহনেও বিঘ্ন ঘটে।

অ্যাম্বুলেন্স সেন্টার চালু হলে নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার আওতায় এসব গাড়ি পরিচালিত হবে। ফলে জরুরি বিভাগের সামনে অপ্রয়োজনীয় ভিড় ও যানজট কমানোর পাশাপাশি রোগী পরিবহন প্রক্রিয়াতেও শৃঙ্খলা ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জলাবদ্ধতা ও ট্রলি ব্যবস্থাপনাও আলোচনায়

সভায় শুধু অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনাই নয়, রোগীদের সুবিধার্থে ট্রলি ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা হয়। এ ছাড়া অতিবৃষ্টির সময় হাসপাতালের জরুরি বিভাগ ও বহির্বিভাগের সামনের সড়কে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিকভাবে কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যায়, সে বিষয়েও করণীয় নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

রোগীদের হাসপাতালের ভেতরে আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রলির সহজলভ্যতা ও ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করার বিষয়টি সভায় গুরুত্ব পায়।

‘রোগীর স্বার্থই কেন্দ্রবিন্দু’

সভায় রামেকহা পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পিকেএম মাসুদ উল ইসলাম বলেন, রোগীর স্বার্থই সকল পক্ষের কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত। গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সক্রিয়, আন্তরিক ও সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন।

তিনি সভায় অংশগ্রহণ ও সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান এবং রোগীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

পুলিশের সহযোগিতার আশ্বাস

সভায় আরএমপির পক্ষে উপস্থিত ছিলেন উপপুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. নূর আলম সিদ্দিকী, উপপুলিশ কমিশনার (বোয়ালিয়া) মো. গোলাম রাব্বানী শেখ, রাজপাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আবুল কালাম আজাদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পক্ষে ডা. আয়েশা উপস্থিত থেকে রোগীদের স্বার্থে গৃহীত উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স মালিক ও চালকদের পক্ষে মো. নিশান, মো. ডালিমসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন। তারা রোগীদের দুর্ভোগ কমাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের গৃহীত যৌক্তিক পদক্ষেপ বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন।

রামেকহা কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অ্যাম্বুলেন্স সেন্টার চালুর মাধ্যমে শুধু বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনাতেই নয়, হাসপাতালের সার্বিক পরিবহন ব্যবস্থায়ও শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে। এখন সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ।

এসএ