ধোঁয়ায় ঘেরা নার্সারিতে ৮ সেকেন্ডের লড়াই
প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সম্মাননা পেয়েও ঘুম নেই পাকিস্তানি নার্সের, কিন্তু কেন?
পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদের শীর্ষ সরকারি হাসপাতাল ‘পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস’ (পিমস)-এর নার্সারি ওয়ার্ডে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৪টি নবজাতক পুড়ে মারা গেলেও নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাত্র ৮ সেকেন্ডে একটি শিশুকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন স্টাফ নার্স রাজিআ নুরিন (৩৮)।
অসীম সাহসিকতার জন্য পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের পক্ষ থেকে তাকে বীরের মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দেওয়া হলেও, বাকি ১৪টি শিশুকে বাঁচাতে না পারার অনুতাপ আজও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে এই (নার্স) সেবিকাকে।
ভয়াবহ সেই ঘটনার আট দিন পর আল জাজিরাকে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে রাজিআ নুরিন সেই সকালের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন।
গত ২৬ আগস্ট ভোর ৬টা ৩৮ মিনিটে পিমস হাসপাতালের নার্সারি ওয়ার্ডে সকালের ইনজেকশন প্রস্তুত করছিলেন রাজিআ। সে সময় কাচের ওপারে অস্বাভাবিক তীব্র লাল আলোর শিখা দেখতে পান তিনি। কোনো কিছু না ভেবেই সহকর্মী নার্সকে চিৎকার করে শিশুদের বাঁচানোর নির্দেশ দিয়ে তিনি নার্সারির ভেতরে ছুটে যান। সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ৬টা ৩৮ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডে তিনি ভেতরে ঢোকেন এবং মাত্র আট সেকেন্ডের মাথায় একটি নবজাতককে কোলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। তিনি শিশুটিকে করিডোরে থাকা এক চিকিৎসকের হাতে তুলে দিয়ে পুনরায় বাকিদের উদ্ধারে যেতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে পুরো ঘর ঘন কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়।
রাজিআ বলেন, “একটি বিস্ফোরণের মতো হয়েছিল। চোখের পলকে চারপাশ ঘন ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। আমি ভেবেছিলাম আরও ৫-৬ বা ৮টি বাচ্চাকে বের করে নিয়ে আসব, কিন্তু আগুনের গতি আমার চেয়েও দ্রুত ছিল।”
সেই নার্সারি ওয়ার্ডে মোট ১৫টি নবজাতক ছিল। এর মধ্যে কেবল রাজিআর কোলে ফিরে আসা প্রি-টার্ম (অপরিণত) শিশুটিই অলৌকিকভাবে বেঁচে যায়; বাকি ১৪টি নবজাতকই আগুনে পুড়ে প্রাণ হারায়।
গত বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সেবিকা রাজিআ নুরিনকে তার সাহসিকতার জন্য ‘জাতির কন্যা’ আখ্যা দেন এবং দেশটির ইতিহাস তাকে ‘স্বর্ণাক্ষরে’ মনে রাখবে বলে মন্তব্য করেন। সরকার তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সিতারা-ই-খিদমত’ বেসামরিক পদক দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং এক কোটি পাকিস্তানি রুপির (৩৬ হাজার ডলার) একটি চেক তুলে দিয়েছে।
তবে রাষ্ট্রীয় এই স্বীকৃতিও রাজিআর ভেতরের ক্ষত সারাতে পারছে না। প্রচণ্ড জ্বর, ধোঁয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত ফুসফুসের কাশি আর নির্ঘুম রাত কাটছে তার। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ও ঘুমের ওষুধেও কাজ হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
রাজিআ নুরিন বলেন, “সেই দিনটির পর থেকে আমি দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি। চোখ বন্ধ করলেই ঘটনার দৃশ্যগুলো ভেসে ওঠে। সেই শিশুরা, তাদের আর্তনাদ আর মায়েদের বুকফাটা চিৎকার আমাকে ঘুমাতে দেয় না। হোস্টেলে একা থাকলে এই স্মৃতিগুলোই ফিরে ফিরে আসে।”
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বেঁচে যাওয়া সেই একমাত্র শিশুটির মায়ের সাথে দেখা হওয়ার স্মৃতি তুলে ধরে রাজিআ বলেন, “শিশুটির মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলেন, আমিও কেঁদেছি। কারণ বাকি শিশুদের জন্য আমার বুকের ভেতরটা এখনও হাহাকার করছে।”
সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে রাজিআ বলেন, “আমার কেবলই অনুতাপ হয়। বাকি বাচ্চাগুলোকে আমি কেন বাঁচাতে পারলাম না, সেই অনুশোচনা আমাকে ছাড়ছে না।”
এদিকে পাকিস্তান সরকারের প্রাথমিক তদন্তে অগ্নিকাণ্ডের নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে এসি, ইনকিউবেটর কিংবা শর্ট সার্কিটের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসাকর্মীরা শিশুদের ফেলে পালিয়ে যাননি বলে তদন্তে নিশ্চিত করা হয়েছে।
সূত্র: Al Jazeera
এনএ




Comments