বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়ক উত্তমকুমার। প্রয়াণের চার দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাঙালির আবেগ ও ভালোবাসায় এখনো সমানভাবে জড়িয়ে আছেন তিনি। প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা ও প্রাসঙ্গিকতা অটুট। মহানায়কের স্মৃতিচারণা করে এবার তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়।
প্রসেনজিতের মতে, উত্তমকুমার বাঙালির কাছে কখনোই অতীত হয়ে যাননি। বরং তিনি এখনো বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘উত্তমকুমার নামের এক অভিনেতা ছিলেন, এক সময়ে’—এমন কথা কোনো বাঙালির মুখে শোনা যাবে না বলেই মনে করেন তিনি। কারণ মহানায়কের হাসি, চোখের দৃষ্টি, হাঁটা-চলা কিংবা কথা বলার ধরন—সবকিছুই যেন বাঙালির জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে।
মহানায়কের সঙ্গে বাঙালির সম্পর্কটিকে একটু অন্যরকম বলে মনে করেন প্রসেনজিৎ। তাঁর ভাষায়, উত্তমকুমার কারও আত্মীয় নন, অথচ কোথাও গিয়ে তিনি যেন সবারই আপনজন। কারও কাছে তিনি বাবা-মায়ের দেখা সিনেমার নায়ক, কারও কাছে শৈশবের রবিবারের দুপুর, কারও কাছে প্রথম প্রেমের মুখ। আবার কারও কাছে তিনি অভিনয়ের এক অসাধারণ পাঠ।
প্রসেনজিৎ বলেন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম নিজেদের মতো করে উত্তমকুমারকে আবিষ্কার করেছে। তবে শুধু নস্টালজিয়া দিয়ে কোনো শিল্পীকে এত দীর্ঘ সময় বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এর পেছনে রয়েছে মহানায়কের অভিনয়ের বহুমুখিতা।
উত্তমকুমারের অভিনয়ের বৈচিত্র্য তুলে ধরে প্রসেনজিৎ বলেন, একই মানুষ কখনো নিখাদ প্রেমিক, কখনো সাধারণ মধ্যবিত্ত, কখনো অহংকারী তারকা, আবার কখনো ক্লান্ত ও একাকী মানুষের চরিত্রে নিজেকে মেলে ধরেছেন। তাঁর চরিত্রগুলো নিখুঁত ছিল না। তারা ভুল করেছে, ভালোবেসেছে, হারিয়েছে, দ্বিধায় পড়েছে, এমনকি কখনো নিজের কাছেই হেরে গেছে।
প্রসেনজিতের মতে, উত্তমকুমারের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল নিজের তারকা-সত্তাকে অতিক্রম করার ক্ষমতা। এত বড় তারকা হয়েও তিনি নিজের জনপ্রিয়তার ছাপ প্রতিটি চরিত্রের ওপর চাপিয়ে দেননি। বরং চরিত্রের প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে বদলে নিয়েছেন। ফলে অনেক সময় দর্শক ভুলেই গেছেন যে পর্দায় উত্তমকুমার অভিনয় করছেন; তাঁরা চরিত্রটিকেই বাস্তব বলে বিশ্বাস করেছেন।
বর্তমান সময়েও মহানায়কের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে কথা বলেছেন প্রসেনজিৎ। তাঁর মতে, সিনেমার ভাষা বদলেছে, নায়কের সংজ্ঞা বদলেছে, বদলেছে দর্শকের রুচিও। কিন্তু মানুষের ভালোবাসা, একাকিত্ব, অহংকার, ব্যর্থতা কিংবা স্বীকৃতির আকাঙ্ক্ষার মতো অনুভূতিগুলো বদলায়নি। আর এসব চিরন্তন অনুভূতিই উত্তমকুমার অসাধারণভাবে পর্দায় তুলে ধরেছিলেন।
তাই সময়ের সঙ্গে উত্তমকুমারের প্রাসঙ্গিকতা কমে যাওয়ার কোনো কারণ দেখেন না প্রসেনজিৎ। বরং তাঁর মতে, একজন শিল্পীর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো—তাঁকে নতুন করে আবিষ্কার করার সুযোগ কখনো শেষ না হওয়া।
উত্তমকুমারকে বাঙালির এক বিশেষ অভ্যাসের সঙ্গেও তুলনা করেছেন প্রসেনজিৎ। তাঁর কথায়, যা প্রয়োজন হলে মনে করতে হয়, তা স্মৃতি। আর যা আলাদা করে মনে করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, তা অভ্যাস। বাঙালির কাছে উত্তমকুমার তেমনই এক অভ্যাস—যাঁর কাছে বারবার ফিরে আসা যায়।
এসএস




Comments