ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ ৯ সেপ্টেম্বর। ২০২৫ সালের এই দিনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বেশির ভাগ পদে জয় পায় ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। এক বছর পর এসে আবাসনসংকট, খাবারের মান, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ডাকসু নির্বাচনের আগে ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, প্রথম বর্ষ থেকেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য হলে বৈধ আসন নিশ্চিত করা হবে। তবে সেই প্রতিশ্রুতি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হলের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী শাফিনূর রহমান তাজিমের ক্লাস শুরু হয়েছে এপ্রিল মাসে। পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি হলে আসন পাননি। ফলে বাধ্য হয়ে বাইরে ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে তাকে।
ডাকসুর এক বছর পূর্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহলে সংগঠনটির কার্যক্রম নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। একদিকে হল দখল, মারামারি কিংবা বাধ্যতামূলক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার মতো পুরোনো চিত্র অনেকটাই অনুপস্থিত। অন্যদিকে, ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রতিশ্রুতি এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের একাংশের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান বলেন, ভোটের রাজনীতির কারণে কিছু পরিবর্তন এসেছে, এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এসব পরিবর্তন কতটা টেকসই হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
৩৬ প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন কতটা?
নির্বাচনের আগে ১২ মাসে ৩৬টি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট। ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ দাবি করেছেন, ইশতেহারের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রশাসনের পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ায় সব কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি বলে তাঁদের বক্তব্য।
ডাকসুর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কমিটি গঠন ও হল সংসদের মাধ্যমে তদারকি, আবাসনসংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প, নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন বাস, মাতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর, অনলাইন পেমেন্ট চালু, কমনরুম সংস্কার, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে নতুন রিসোর্স যুক্ত করা, স্কিল ডেভেলপমেন্ট সামিট, মেডিকেল সেন্টার আধুনিকায়ন ও বাসের ট্রিপ বাড়ানোর মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ডাকসুর অর্থসংক্রান্ত অভিযোগ নাকচ করে বলেছেন, ডাকসুর জন্য যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ ছিল, তার চেয়েও বেশি অর্থ দেওয়া হয়েছে।
খাবারের মান ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
শিক্ষার্থীদের অন্যতম বড় সমস্যা খাবারের মান। নির্বাচনী ইশতেহারে বিষয়টি অগ্রাধিকার পেলেও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্থায়ী কোনো পরিবর্তন আসেনি। সম্প্রতি কয়েকটি হলের ক্যানটিনের খাবারে কেঁচো, ব্লেড ও তেলাপোকা পাওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।
নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেস্টফিডিং রুম, চাইল্ড কেয়ার কর্নার, নিরাপদ পরিবহন ও আত্মরক্ষার প্রশিক্ষণের মতো কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে অনাবাসিক ছাত্রীদের প্রবেশাধিকার, সব কমনরুমে নারী কর্মচারী নিয়োগ এবং হলগুলোতে গার্ডিয়ান লাউঞ্জ তৈরি।
বিতর্কও কম নয়
ডাকসুর এক বছরে কয়েকজন নেতার কর্মকাণ্ড নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। উচ্ছেদ অভিযানে ক্ষমতার অপব্যবহার, শিশু-কিশোরদের কান ধরে ওঠবস করানো, আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষককে হেনস্তা, কনসার্টে সিগারেট বিতরণ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক এবং অন্যান্য ঘটনায় ডাকসুর কয়েকজন নেতা সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
এ ছাড়া লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির বিরোধিতা করে নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ডাকসুর কয়েকজন নেতার জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ভয়ের সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তমত, বাক্স্বাধীনতা ও একাডেমিক স্বাধীনতার পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খানের মতে, যে আধিপত্যবাদী ও ভয়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছিল, ডাকসু নির্বাচনের পর তার কিছু প্রবণতা ফিরে এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার, মব তৈরি, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং প্রতিপক্ষকে নেতিবাচকভাবে চিহ্নিত করার মতো প্রবণতার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
তবে ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো ধরে রাখতে নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনেকে। বর্তমান ডাকসুর মেয়াদ শেষ হবে ১৪ সেপ্টেম্বর। এরপর নির্বাচন না হলে মেয়াদ আরও তিন মাস বাড়তে পারে। পরবর্তী সময়েও নির্বাচন না হলে বর্তমান ছাত্র সংসদ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
সব মিলিয়ে, ডাকসুর এক বছরে কিছু ক্ষেত্রে পরিবর্তন এলেও আবাসন, খাবারের মান, নিরাপত্তা ও প্রতিশ্রুতির টেকসই বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো রয়েছে প্রশ্ন। ফলে নির্বাচনের আগে দেওয়া ৩৬ দফা প্রতিশ্রুতির কতটা বাস্তবে রূপ পেয়েছে—এক বছর পূর্তিতে সেটিই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।
ডিআর




Comments