নড়াইলে মধুমতি-চিত্রার ভাঙনে বিলীন হচ্ছে বিস্তীর্ণ জনপদ, মিলছে না প্রতিকার
নড়াইলের ঐতিহ্যবাহী মধুমতি ও চিত্রা নদীতে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে নদীভাঙনে জেলার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক বসতবাড়ি, উপাসনালয়, ফসলি জমি, ঐতিহ্যবাহী হাট-বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে নদীপাড়ের হাজারো মানুষ চরম আতঙ্ক ও দিশেহারা অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যুগের পর যুগ ধরে নদীভাঙন রোধে জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন-নিবেদন করেও স্থায়ী কোনো প্রতিকার মেলেনি। ফলে প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) চিত্রা নদীপাড়ের বাসিন্দা অশোক কুমার বিশ্বাস জানান, নড়াইল সদর উপজেলার হবখালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সীমানাপ্রাচীরে ভয়াবহ ফাটল দেখা দিয়েছে। একই এলাকায় পাজারখালি মহাশ্মশানের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। হবখালী ইউনিয়নের সুব্দিডাঙ্গা, পাজারখারী, ভান্ডালীপাড়াসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে প্রতিদিনই তীরের নতুন নতুন জায়গা নদীগর্ভে ধসে পড়ছে।
হবখালী ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক আনিসুর রহমান বলেন, "হাজারো মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম ভরসাস্থল এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি এখন নদীভাঙনের চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।"
পাজারখালি মহাশ্মশানের সাবেক সভাপতি সুনিল জানান, মহাশ্মশানের মূল অংশের বড় একটি অংশ চিত্রা নদীতে তলিয়ে গেছে। শ্মশানের বিশ্রামাগার ও মরদেহ দাহ করার প্রধান স্থানটিও নদীগর্ভে চলে গেছে। তিন গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সৎকারের এই একমাত্র স্থানটি এখন অস্তিত্ব সংকটে।
অন্যদিকে, লোহাগড়া উপজেলার শালনগর, জয়পুর, লোহাগড়া, ইতনা ও কোটাকোলসহ কয়েকটি ইউনিয়নে মধুমতি নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। আঞ্চলিক বিখ্যাত পাটের মোকাম হিসেবে পরিচিত শালনগর ইউনিয়নের শিয়ারবর হাটের কাছাকাছি নদীভাঙন চলে আসায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন শত শত পাট ব্যবসায়ী।
শিয়ারবর হাটের পাট ব্যবসায়ী হাসান আলী বলেন, "যুগ যুগ ধরে এই হাটে নদীপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা নৌকা ও ট্রলারে পাট এনে সরবরাহ করেন। দ্রুত এটি রোধ না করা গেলে বৃহত্তম এই পাটের মোকামটি মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।"
ছাগলছেড়া গ্রামের নদীভাঙন তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দা ও নারী ইউপি সদস্য নাজমা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "নদীভাঙনের কারণে গত কয়েক বছরে আমি তিনবার বসতবাড়ি সরাতে বাধ্য হয়েছি। আমার মতো গ্রামের শতাধিক পরিবার আজ গৃহহীন ও সর্বস্বান্ত।"
আমডাঙ্গা গ্রামের প্রবীণ কৃষক মন্ডল মোল্যা বলেন, "জীবদ্দশায় মধুমতি নদীর ভাঙনে স্বজনদের ভিটেমাটি, মসজিদ, বাপ-দাদার কবরস্থান, খেলার মাঠ ও প্রাথমিক-হাইস্কুল হারিয়েছি। এসব মনে পড়লে নিজেকে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।" কোটাকোল ইউনিয়নের ঘাঘা গ্রামের বাসিন্দা কামাল হোসেন জানান, ভাঙনে শত শত একর ফসলি জমি, মাছের বাঁওড় ও বিশাল জনপদ ধ্বংস হয়ে গেছে।
নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বলেন, "বর্ষা মৌসুমে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, মহাশ্মশান ও বসতবাড়িসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলা ও প্রতিরক্ষামূলক কাজের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। জেলায় নদীভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একটি ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ফিজিবিলিটি স্টাডির প্রতিবেদন পাওয়ার পর স্থায়ী নদীশাসন কাজ শুরু হবে।"
তবে স্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব না করে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন নড়াইলবাসী, তা না হলে প্রতিবছর মানচিত্র থেকে মুছে যাবে নতুন নতুন গ্রাম ও অবকাঠামো।
ডিআর




Comments