Image description

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ঘিরে বিশ্ববাজারে আবারও বেড়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম। সোমবার ১৪ সেপ্টেম্বর ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলার ছাড়িয়েছে। সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোয় হামলা এবং পারস্য উপসাগরে জাহাজে হামলার ঘটনায় বৈশ্বিক সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৭.৮২ ডলারে ওঠে। দিনের শুরুতে দাম ১০৮.২৩ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই তেলের দামও ৩ শতাংশের বেশি বেড়ে ১০৩ ডলারের ওপরে ওঠে।

তেলের দাম বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হামলা এবং পারস্য উপসাগরে জাহাজে হামলার কথা জানিয়েছে রয়টার্স। সৌদি আরবের এই পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর দিয়ে তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ। পাইপলাইনটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।

এদিকে এশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোও সৌদি আরব থেকে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় এশিয়ার ক্রেতারা বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছেন। এতে এশিয়ার বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ও পরিবহন ব্যয় আরও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?

বিশ্ববাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় ১০০ ডলারের ওপরে থাকলে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ দেশের পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেলের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।

রয়টার্সের মার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ বছরে প্রায় ১৪ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। এর একটি অংশ সৌদি আরবের আরামকো ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের এডিএনওসির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে আসে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও বাংলাদেশ পরিশোধিত জ্বালানি তেলের কিছু সরবরাহ বিকল্প উৎস থেকে নিশ্চিত করার চেষ্টা করছিল।

তেলের দাম বাড়লে প্রথম ধাক্কা আসতে পারে আমদানি ব্যয়ে। জ্বালানি আমদানিতে বেশি অর্থ ব্যয় হলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে পণ্য পরিবহন, কৃষি উৎপাদন ও শিল্পকারখানার খরচও বাড়ার ঝুঁকি থাকে।

এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দামে পড়তে পারে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষি, গণপরিবহন ও পণ্যবাহী পরিবহনের ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির পরিমাণও কম নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটি অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য আমদানিতে মোট ১০ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে বলে বাংলাদেশি প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে জানানো হয়েছে।

তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেই দেশে সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম একই হারে বেড়ে যাবে—এমনটা নিশ্চিত নয়। দেশে খুচরা জ্বালানির দাম নির্ধারণে আমদানি ব্যয় ছাড়াও সরকারি মূল্যনীতি, মজুত, পরিবহন ব্যয় ও অন্যান্য বিষয় ভূমিকা রাখে।

সামনে কী হতে পারে?

রয়টার্সের আজকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এশিয়ার তেল ব্যবসায়ীরা মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম দেখছেন। ফলে তেলের দাম আরও কিছু সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্ববাজারের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সর্বশেষ পূর্বাভাসেও ২০২৬ সালে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ কমার আশঙ্কা করা হয়েছে। সংস্থাটি বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও উপসাগরীয় অঞ্চলে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় চলতি বছর বৈশ্বিক তেল সরবরাহ দৈনিক ৫৭ লাখ ব্যারেল বা প্রায় ৬ শতাংশ কমতে পারে।

ফলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশসহ আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং মূল্যস্ফীতির চাপ নতুন করে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠতে পারে।

এনএ