আল জাজিরার এক্সপ্লেইনার
চীনের নতুন পিংলু খাল: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যে কতটা বদল আনবে?
চীন দক্ষিণাঞ্চলে নিজেদের প্রথম আধুনিক নদী-থেকে-সমুদ্র নৌপথ ‘পিংলু খাল’ নৌ চলাচলের জন্য খুলে দিচ্ছে। দেশটির দাবি, নতুন এই জলপথ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় চীন থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে পণ্য পরিবহনের দূরত্ব ও ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনবে।
কোথায় পিংলু খাল?
পিংলু খাল পুরোপুরি চীনের দক্ষিণাঞ্চলীয় কুয়াংশি অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত। অঞ্চলটির একদিকে ভিয়েতনামের সীমান্ত, অন্যদিকে দক্ষিণ চীন সাগর। ১৩৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই জলপথ শিজিয়াং নদীকে বেইবু উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বেইবু উপসাগর টংকিন উপসাগরের উত্তর-পশ্চিম অংশ, যা দক্ষিণ চীন ও উত্তর ভিয়েতনামের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত।
এই খাল চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইউনান ও কুইচৌসহ সমুদ্র থেকে দূরের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তুলনামূলকভাবে সহজে সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত হবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই খাল?
পিংলু খাল চীনের ‘নিউ ইন্টারন্যাশনাল ল্যান্ড-সি ট্রেড করিডোর’-এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই বাণিজ্য করিডোরের লক্ষ্য পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের অঞ্চলগুলোকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা।
এটি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর বৃহত্তর যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত। এই উদ্যোগের আওতায় সড়ক, রেলপথ ও বন্দরসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর মাধ্যমে চীনকে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
কতটা কমবে দূরত্ব ও খরচ?
কুয়াংশি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, পিংলু খাল ব্যবহারে দক্ষিণ-পশ্চিম চীন থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে পণ্য পরিবহনের নৌপথ প্রায় ৫৬০ কিলোমিটার কমে যাবে।
একই সঙ্গে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় ১৮ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের পূর্বাভাস।
কুয়াংশি সরকারের উপমহাসচিব চাং ঝিওয়েনের হিসাব অনুযায়ী, শুধু পরিবহন ব্যয় কমার কারণে বছরে ৫ বিলিয়ন ইউয়ানের বেশি সাশ্রয় হতে পারে, যা প্রায় ৭০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।
খালের সক্ষমতা কত?
পিংলু খাল দিয়ে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টন ধারণক্ষমতার জাহাজ চলাচল করতে পারবে। প্রকল্পটি নির্মাণে আনুমানিক ৭২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ইউয়ান ব্যয় হয়েছে, যা প্রায় ১০ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।
এই জলপথের মাধ্যমে সমুদ্র উপকূল থেকে দূরের চীনা শহর ও শিল্পাঞ্চলগুলো আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের আরও কাছে চলে আসবে।
শুধু কুয়াংশির জন্য নয়
পিংলু খালের সুবিধা শুধু কুয়াংশি অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের বৃহত্তর বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হবে। এই নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে চংছিং, সিচুয়ান প্রদেশের ছেংদু, কুইচৌ ও ইউনানসহ বিভিন্ন অঞ্চল।
এসব এলাকা থেকে পণ্য বেইবু উপসাগরের বন্দরগুলোতে পৌঁছাবে। সেখান থেকে তা সমুদ্রপথে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানো যাবে।
চীন-দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্য কতটা বাড়ছে?
পিংলু খাল চালুর সময় চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যও দ্রুত বাড়ছে। চীনের শুল্ক প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দুই পক্ষের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৪ দশমিক ৩৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছেছে, যা প্রায় ৬৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই বাণিজ্য ১৮ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে।
ফলে পিংলু খাল শুধু একটি নতুন নৌপথ নয়; চীনের অভ্যন্তরীণ অঞ্চল থেকে সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পৌঁছানোর একটি নতুন সংযোগ হিসেবে এটিকে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারণের সময় এই জলপথ পরিবহন দূরত্ব ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি করছে।
সূত্র: আল জাজিরা
এনএ




Comments