Image description

ভেনেজুয়েলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রায় ৪০০ কোটি ডলার মূল্যের স্বর্ণের মজুত যুক্তরাজ্যের ব্যাংক অব ইংল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে স্থানান্তরের বিষয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চার ব্যক্তির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস।

সম্ভাব্য চুক্তি অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান দেলসি রদ্রিগেজ স্বর্ণের ওপর আইনগত নিয়ন্ত্রণ পাবেন। তবে মজুত স্বর্ণ সরাসরি বিক্রি করার সুযোগ সরকারের থাকবে না। এর পরিবর্তে স্বর্ণকে জামানত হিসেবে রেখে ঋণ নেওয়া এবং সেই অর্থ সরকারি ব্যয় ও পুনর্গঠন কাজে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

বিশেষ করে জুনে হওয়া ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের পর ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে এই অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে বলে আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় চলমান আলোচনায় এই সমঝোতাকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তিটি চূড়ান্ত হলে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে থাকা ভেনেজুয়েলার স্বর্ণ নিয়ে প্রায় সাত বছর ধরে চলা আইনি ও রাজনৈতিক বিরোধের অবসান হতে পারে।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ তৎকালীন বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে ভেনেজুয়েলার বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর বিরোধী পক্ষ ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে সংরক্ষিত ভেনেজুয়েলার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বর্ণের ওপর নিয়ন্ত্রণ দাবি করে। বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষ পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়।

তবে বর্তমান আলোচনায় যুক্ত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সমঝোতা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত হয়নি। চুক্তির কারিগরি ও আইনি বিভিন্ন বিষয় নিষ্পত্তিতে আরও সময় প্রয়োজন হতে পারে।

বিরোধী পক্ষের আলোচনায় যুক্ত এক নেতা জানান, স্বর্ণ যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তরিত হলেও দেলসি রদ্রিগেজ সরাসরি এর নিয়ন্ত্রণ পাবেন না। স্বর্ণের ব্যবহার তদারকি ও বিভিন্ন বিধিনিষেধের আওতায় থাকবে।

গত মাসে ভেনেজুয়েলা সরকার ও বিরোধী পক্ষ জানিয়েছিল, ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের ভল্টে থাকা প্রায় ৩১ টন স্বর্ণের মজুত ব্যবহারের পথ তৈরি করতে তারা যৌথভাবে কাজ করছে। তবে বিরোধী পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে স্বর্ণের মজুতের সম্ভাব্য অপব্যবহার ঠেকাতে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়ে আসছে।

এর মধ্যেই যুক্তরাজ্য ও ভেনেজুয়েলার সম্পর্কেও নতুন অগ্রগতি দেখা দিয়েছে। চলতি সপ্তাহে দুই দেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে সম্মত হয়েছে। কারাকাসে আবার রাষ্ট্রদূত নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাজ্য। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলায় নতুন নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে চলমান আলোচনাকেও স্বাগত জানিয়েছে দেশটি।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে ভেনেজুয়েলার জাতীয় পরিষদের বর্তমান প্রধান হোর্হে রদ্রিগেজ লন্ডনে যুক্তরাজ্য সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য ‘সুসংবাদ’ আসছে বলে মন্তব্য করেন।

অন্যদিকে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্যের আদালতের নতুন নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত ব্যাংক স্বর্ণ স্থানান্তরসংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। স্বর্ণের ওপর কার আইনগত কর্তৃত্ব রয়েছে, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে যুক্তরাজ্যের আদালতের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে।

সরকার ও বিরোধী পক্ষের চলমান আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য হলো ভেনেজুয়েলায় নতুন নির্বাচন আয়োজনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা। ২০২৪ সালের নির্বাচনে নিকোলাস মাদুরো নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। তবে বিরোধী পক্ষ তাদের স্বাধীনভাবে যাচাই করা ভোটের হিসাব তুলে ধরে দাবি করে, নির্বাচনে মাদুরো বড় ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন।

জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভেনেজুয়েলার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ আরও জোরালো হয়। এরপর দেশটির ওপর আরোপিত কিছু মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়। এপ্রিলে প্রায় সাত বছর পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ভেনেজুয়েলার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করে। এর ফলে কারাকাস আইএমএফে থাকা তহবিল ব্যবহারের সুযোগ পায়।

জানুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়া দেলসি রদ্রিগেজ বর্তমানে দেশটির অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন উদ্যোগের পথ খুঁজছেন। এর আগে থেকেই ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর ছিল। এর মধ্যে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে।

সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস

এসএ