Image description

নেত্রকোণা জেলার পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত হাওরবেষ্টিত উপজেলা খালিয়াজুরী। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। বর্ষায় বিস্তীর্ণ হাওর হয়ে ওঠে এক অপরূপ জলরাশি, আর হেমন্তে পানি নেমে গেলে জেগে ওঠে ধানক্ষেত ও সবুজের বিস্তীর্ণ প্রান্তর। প্রকৃতির এমন অপার সৌন্দর্য ঘিরে থাকলেও এখানে নেই কোনো পরিকল্পিত বিনোদন বা পর্যটন কেন্দ্র। ফলে অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পর্যটনের দিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে খালিয়াজুরী।

স্থানীয়দের ভাষায়, বছরের প্রায় ছয় মাস পানিতে আর ছয় মাস শুকনো—এভাবেই চলে হাওরবাসীর জীবন। বর্ষাকালে উপজেলা সদরে যাতায়াতের প্রধান বাহন ট্রলার ও নৌযান। হেমন্তে পানি কমে গেলে শুরু হয় সড়কপথে নানা ভোগান্তি। জেলা শহর নেত্রকোণায় যাতায়াতেও পোহাতে হয় দীর্ঘ পথ ও দুর্ভোগ। এসব কষ্টকে প্রকৃতির নিয়ম হিসেবেই মেনে নিয়ে জীবনযাপন করে আসছেন এখানকার মানুষ।

কিন্তু বিনোদনের ক্ষেত্রে যেন আরও বেশি বঞ্চিত এই জনপদ। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সরকারি নানা উন্নয়ন প্রকল্প থাকলেও হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র। নেই পর্যটকদের জন্য ভালো থাকার ব্যবস্থা, মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা কিংবা পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটানোর নিরাপদ ও মনোরম কোনো স্থান।

অথচ খালিয়াজুরীর হাওর, নদী, জলরাশি ও সবুজ প্রকৃতি হতে পারে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য। পরিকল্পিতভাবে একটি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা গেলে বর্ষায় নৌভ্রমণ, হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ এবং হেমন্তে সবুজ-সোনালি প্রকৃতির দৃশ্য দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যটক আসতে পারেন। এতে একদিকে যেমন স্থানীয় মানুষের বিনোদনের সুযোগ তৈরি হবে, অন্যদিকে সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খালিয়াজুরী উপজেলা থেকে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব পেয়ে থাকে। স্থানীয়দের দাবি, এর পরিমাণ প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা। এত বিপুল রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনাময় একটি উপজেলায় পর্যটন খাতে সরকারি বিনিয়োগ হলে তা শুধু বিনোদনের সুযোগই সৃষ্টি করবে না, বরং স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

একটি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্রের সঙ্গে রেস্টুরেন্ট, আবাসন, নৌভ্রমণ, শিশুদের বিনোদন ব্যবস্থা, ওয়াচ টাওয়ার, হাঁটার পথ, বসার স্থান ও হাওরের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য বিভিন্ন সুবিধা গড়ে তোলা যেতে পারে। এর মাধ্যমে স্থানীয় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নৌযান মালিক, চালক, হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপকৃত হবেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, খালিয়াজুরীকে শুধু হাওরের দুর্গম জনপদ হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারলে এই অঞ্চল দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন এলাকায় পরিণত হতে পারে। প্রয়োজন শুধু সরকারি সদিচ্ছা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

তাদের প্রত্যাশা, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর খালিয়াজুরীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটন সম্ভাবনা সরেজমিনে পরিদর্শন করে একটি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেবে। এতে হাওরবাসীর দীর্ঘদিনের বিনোদনবঞ্চনা যেমন দূর হবে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধিরও সুযোগ তৈরি হবে।

হাওরের বুক জুড়ে সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, বর্ষার জলরাশি আর হেমন্তের সবুজ-সোনালী প্রকৃতি—সবই আছে খালিয়াজুরীতে। শুধু নেই সেই সৌন্দর্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরার পরিকল্পিত আয়োজন। এখন সময় এসেছে সম্ভাবনার এই জনপদকে পর্যটনের মানচিত্রে তুলে ধরার।

ডিআর