জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বিশ্বের যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে হওয়া উচিত। তিনি বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদাকে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
আজ নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিসহ নানা বিষয় তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মুখে পড়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে। সংঘাতের ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবিক সংকটও তৈরি হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, যে কোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি শান্তিময় ও মানবিক বিশ্ব চায়, যেখানে মারণাস্ত্রের পরিবর্তে যুক্তি, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা পরিবর্তনের হাতিয়ার হবে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সমঝোতামূলক বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন খাতের অর্থ সামরিক খাতে স্থানান্তরের প্রবণতা বিশ্বশান্তির জন্য বাধা সৃষ্টি করছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
বিশ্ব মানবতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘের যেকোনো উদ্যোগে বাংলাদেশের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন
ফিলিস্তিন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের প্রসঙ্গ
ভাষণের শুরুতে সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সভাপতিকে অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী এবং দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। বিদায়ী সভাপতিকেও তাঁর নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জানান তিনি।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মত্যাগকারীদেরও স্মরণ করেন তিনি।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণই সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।
পরিবারের সদস্যদের জাতিসংঘে ভাষণের স্মৃতি
জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে তাঁর পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য দেওয়ার কথাও স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এর আগে জাতিসংঘে বাংলাদেশের জনগণ ও দেশের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন।
তিনি বলেন, একইভাবে তিনিও বাংলাদেশের জনগণ ও দেশের স্বার্থ এবং একটি শান্তিময় বিশ্ব সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় জাতিসংঘে বক্তব্য দিচ্ছেন।
বহুপাক্ষিকতার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: এ ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভার্স ফর অল’-এর প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল রয়েছে বলে জানান তিনি। ‘পিসবিল্ডিং কমিশন’-এর ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি, সংঘাত প্রতিরোধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন।
শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারীদের অংশগ্রহণ
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অবদানের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।
প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারীদের সাহসী অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ কর্মসূচির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
নিরাপদ অভিবাসনের ওপর গুরুত্ব
অভিবাসন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতিতে অভিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বাংলাদেশ নিয়মিত, নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আরও জোরালো বৈশ্বিক সহযোগিতার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
এসএস




Comments