Image description

বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। কীর্তিনাশার বুকে একের পর এক ছুটে চলছে রঙিন নৌকা। শত শত বৈঠার একসঙ্গে ওঠানামায় তৈরি হচ্ছে ছন্দ, সেই ছন্দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নৌকার গতি। নদীর দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাস, করতালি আর হর্ষধ্বনিতে মুখর চারপাশ।

কখনো বৈঠার শব্দ, কখনো দর্শকদের চিৎকার—সব মিলিয়ে কীর্তিনাশা নদী যেন পরিণত হয়েছিল এক বিশাল উৎসবের মঞ্চে। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নারী-পুরুষ, বিভিন্ন বয়সী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে নদীর দুই পাড়ে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ।
শরীয়তপুর সদর উপজেলার কীর্তিনাশা নদীতে অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচের ফাইনাল ঘিরে শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) এমন দৃশ্যই দেখা যায়। আয়োজকদের ভাষ্য, তরুণ সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখা এবং খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এ নৌকাবাইচের আয়োজন করা হয়। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, তারেক রহমান বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
শুক্রবার দুপুরে ডোমসার ইউনিয়নের তেতুলিয়া থেকে রাজগঞ্জ ব্রিজ হেলিপ্যাড পর্যন্ত নদীপথে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব। ফাইনালে অংশ নেওয়া নৌকাগুলো নদীর বুক চিরে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে দর্শকদের উত্তেজনা। শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় আমগ্রাম এক্সপ্রেস প্রথম, সাত সমাজ এক্সপ্রেস-১ দ্বিতীয় এবং মামা ভাগিনা এক্সপ্রেস তৃতীয় স্থান অর্জন করে।
আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা গেছে, ১৪ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া এ প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন এলাকার মোট ১৪টি নৌকা অংশ নেয়। ১৪ সেপ্টেম্বর প্রথম রাউন্ড এবং ১৮ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় রাউন্ড অনুষ্ঠিত হয়। এরপর শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনাল।
ফাইনালকে ঘিরে সকাল থেকেই কীর্তিনাশা নদীর দুই পাড়ে বাড়তে থাকে মানুষের ভিড়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর পাড়, সড়ক, আশপাশের মাঠ ও বিভিন্ন স্থানে মানুষের উপস্থিতি আরও ঘন হয়ে ওঠে।
আয়োজকদের দাবি, নৌকাবাইচ দেখতে নদীর দুই পাড়ে প্রায় অর্ধলাখ মানুষের সমাগম ঘটে। স্থানীয়দের অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে সকালেই এসে নদীর পাড়ে অবস্থান নেন। কারও হাতে মোবাইল ফোন, কেউ আবার শিশুদের কাঁধে তুলে দেখাচ্ছেন নৌকার দৌড়।
নৌকা যখন একে অপরকে পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন দর্শকদের উচ্ছ্বাসে কীর্তিনাশার দুই পাড় যেন কেঁপে উঠছিল। মুহূর্তেই কোনো একটি নৌকা এগিয়ে গেলে সেই নৌকার সমর্থকদের মধ্যে শুরু হয় আনন্দ-উল্লাস।
গ্রামবাংলার সংস্কৃতিতে নৌকাবাইচ শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়; এটি নদীকেন্দ্রিক মানুষের জীবন, আনন্দ ও সামাজিক মিলনের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। একসময় বর্ষা এলেই দেশের বিভিন্ন নদ-নদীতে নৌকাবাইচ ছিল অন্যতম প্রধান বিনোদন। আধুনিক বিনোদনের বিস্তারের সঙ্গে সেই ঐতিহ্য অনেকটা আড়ালে চলে গেলেও কীর্তিনাশার বুকে শুক্রবারের আয়োজন যেন সেই পুরোনো দিনের স্মৃতিকেই ফিরিয়ে আনে।
বৈঠার ছন্দে ছুটে চলা নৌকা দেখতে নদীর দুই পাড়ে বিভিন্ন বয়সী মানুষের এমন উপস্থিতি প্রমাণ করে, গ্রামীণ ঐতিহ্য এখনো মানুষের মধ্যে গভীর আগ্রহ তৈরি করতে পারে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। সেই লক্ষ্যেই নৌকাবাইচের মতো আয়োজন করা হয়েছে।
বক্তারা বলেন, শুধু বিনোদন নয়, এ ধরনের আয়োজন তরুণদের সুস্থ বিনোদনের সুযোগ তৈরি করে। পাশাপাশি পারস্পরিক যোগাযোগ ও সামাজিক বন্ধন জোরদার করে। মাদকবিরোধী সামাজিক সচেতনতা তৈরিতেও খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তারা উল্লেখ করেন।
বিপুলসংখ্যক দর্শনার্থীর উপস্থিতি বিবেচনায় রেখে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নৌকার নিরাপত্তা এবং দর্শনার্থীদের সেবায় মেডিকেল টিম, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবকদের রাখা হয়।
ফাইনাল শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জনকারী নৌকার জন্য ছিল ফ্রিজ। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রত্যেকটি নৌকার জন্যও দেওয়া হয় একটি করে টেলিভিশন।
শরীয়তপুর সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ টিপুর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শরীয়তপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সাঈদ আহমেদ আসলাম। প্রধান বক্তা ছিলেন জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক, বীর মুক্তিযোদ্ধা সরদার এ. কে. এম. নাসির উদ্দিন কালু।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেন সরদার, জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন বাদল বেপারী, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সিরাজুল হক মোল্লাসহ দলীয় নেতাকর্মীরা।
দিন শেষে কীর্তিনাশার জলরাশি আবার শান্ত হয়ে আসে। কিন্তু নদীর দুই পাড়ে জমে থাকা মানুষের উচ্ছ্বাস, বৈঠার ছন্দ আর নৌকার দৌড়ের স্মৃতি তখনও যেন থেকে যায় বাতাসে। প্রতিযোগিতার ফলাফল ছাপিয়ে অনেকের কাছে এ আয়োজন হয়ে ওঠে দীর্ঘদিন পর গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা এক চিরচেনা উৎসবকে নতুন করে ফিরে পাওয়ার উপলক্ষ।
এসএ