Image description

বিশ্বের জ্বালানি বাজারে আফ্রিকার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ২০২৫ সালে বিশ্বে মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেল উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশই এসেছে আফ্রিকা থেকে। প্রতিদিন প্রায় ১০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদন করে মহাদেশটি বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। 

অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মতো চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের নিট রপ্তানিকারক হিসেবে অঞ্চলটি অত্যন্ত প্রভাবশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। উৎপাদনের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করলেও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রে এখনো আমদানিনির্ভর আফ্রিকার অধিকাংশ দেশ।

আন্তর্জাতিক সূত্র বলছে, ২০২৫ সালের উৎপাদন ও রপ্তানি চিত্রে আফ্রিকার শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে নাইজেরিয়া, লিবিয়া, আলজেরিয়া ও অ্যাঙ্গোলা। এসব দেশের ওপরই মূলত আফ্রিকার অপরিশোধিত তেল উৎপাদন ও রপ্তানি নির্ভর করছে।

উৎপাদনের দিক থেকে আফ্রিকায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে নাইজেরিয়া। ২০২৫ সালে দেশটির দৈনিক অপরিশোধিত তেল উৎপাদন গড়ে প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেলের মধ্যে ছিল। দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা বাজারে আফ্রিকার অন্যতম প্রধান তেল সরবরাহকারী দেশ নাইজেরিয়া। দেশটির তেলের বড় অংশ ইউরোপ, এশিয়া ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রগামী আফ্রিকার অপরিশোধিত তেলের অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ ৫৫ শতাংশের বেশি, আসে নাইজেরিয়া থেকে।

এ ছাড়া তেল উৎপাদনের পাশাপাশি মজুদের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে লিবিয়া। আফ্রিকার মধ্যে দেশটির প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের মজুদ সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪৮ দশমিক ৪ বিলিয়ন ব্যারেল। ২০২৫ সালে দেশটির দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন ব্যারেল। লিবিয়ার তেল তুলনামূলকভাবে হালকা ও কম সালফারযুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এর চাহিদা রয়েছে।

অন্যদিকে আলজেরিয়া ও অ্যাঙ্গোলাও আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালে আলজেরিয়ার দৈনিক উৎপাদন ছিল প্রায় ১ দশমিক ১৪ মিলিয়ন ব্যারেল। আর অ্যাঙ্গোলার উৎপাদনও দৈনিক ১ মিলিয়ন ব্যারেলের কাছাকাছি বা তার ওপরে ছিল।

তবে আফ্রিকার জ্বালানি খাতের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো- মহাদেশটি বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করলেও পেট্রোল, ডিজেলসহ পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের জন্য এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল। পর্যাপ্ত ও আধুনিক পরিশোধনাগারের অভাব এর অন্যতম প্রধান কারণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে আবার সেই তেল থেকে উৎপাদিত পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করার ফলে আফ্রিকার দেশগুলোর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি দামের ওঠানামার প্রভাবও সরাসরি পড়ে এসব দেশের অর্থনীতিতে।

তবে এই পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে নাইজেরিয়ায়। দেশটির বিশাল ডাঙ্গোটে রিফাইনারির দৈনিক পরিশোধন সক্ষমতা প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল। পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনে যেতে পারলে এটি আফ্রিকার পরিশোধিত জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

নাইজেরিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিশোধন সক্ষমতা বাড়লে দেশটির আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি আফ্রিকার অন্যান্য দেশেও পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের সুযোগ তৈরি হতে পারে। ফলে অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক আফ্রিকা ধীরে ধীরে পরিশোধিত জ্বালানি উৎপাদন ও রপ্তানিতেও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।

আফ্রিকার জ্বালানি খাত অবশ্য নিরাপত্তা সংকট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগের ঘাটতি, পুরোনো অবকাঠামো এবং উৎপাদন স্থাপনায় বিঘ্নসহ নানা সমস্যার মুখোমুখি। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে উৎপাদন ও পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানো গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে মহাদেশটির প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা যখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, তখন আফ্রিকার বিপুল তেলসম্পদ ও নতুন পরিশোধন অবকাঠামো মহাদেশটির জন্য যেমন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি বৈশ্বিক তেলবাজারেও নতুন ভারসাম্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এমআর