Image description

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অনলাইন জুয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। কাজের সুযোগ ও জীবিকার সীমাবদ্ধতা, অর্থকষ্ট এবং দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার কারণে অনেক তরুণ এ ধরনের জুয়ার দিকে ঝুঁকছেন। এতে ঋণগ্রস্ততা বাড়ার পাশাপাশি অপহরণ, চাঁদাবাজি, পারিবারিক সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধের ঝুঁকিও বাড়ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর।

ক্যাম্পে থাকা জাহেদুল্লাহর অভিজ্ঞতাও এর একটি উদাহরণ। ২০২২ সালে কাজ হারানোর পর এক বন্ধুর মাধ্যমে অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। শুরুতে এক লাখ টাকা থেকে তার আয় বেড়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকা হয়। পরে এক মাসের মধ্যেই সেই অর্থ হারিয়ে ফেলেন।

এরপরও জুয়া খেলা বন্ধ করেননি জাহেদুল্লাহ। স্ত্রীর গয়না বিক্রি এবং আত্মীয়দের কাছ থেকে ধার করে আরও সাড়ে ৭ লাখ টাকা জুয়ার অ্যাকাউন্টে জমা করেন। সেই টাকাও হারানোর পর তিনি সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েন এবং ঋণের বোঝায় পড়েন। পরে পরিবারের সহায়তায় ঋণ পরিশোধ করে জুয়া ছেড়ে দেন তিনি।

ইউএনএইচসিআরের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্থিক সংকট ও জীবিকার সীমাবদ্ধতার কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঘটছে। জুয়ার কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হচ্ছে। এসব বিরোধ থেকে শারীরিক সহিংসতার ঘটনাও ঘটছে।

চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদনে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, শারীরিক নির্যাতন, গোলাগুলি ও সশস্ত্র গ্রুপে যোগদানের ৪৭০টি ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৫৯২ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী ভুক্তভোগী হয়েছেন। এর আগের তিন মাসে ৪৫৫টি ঘটনায় ভুক্তভোগী হন ৮৩২ জন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্ব পালনকারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাও অনলাইন জুয়াকে বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করছেন। ১৪ এপিবিএনের অধিনায়ক মোহাম্মদ সিরাজ আমীন বলেন, জুয়ায় টাকা হারিয়ে অনেকে পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের জন্য নিজেরাই অপহরণের নাটক সাজান।

তবে অনলাইন জুয়া বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, জুয়ার সঙ্গে জড়িতরা ভিপিএন ব্যবহার করায় তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার অনেক রোহিঙ্গা স্থানীয় ব্যক্তিদের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সিম ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করেন।

ক্যাম্পের যেসব এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ভালো, সেখানে গিয়ে অনেকে দলবদ্ধভাবে অনলাইন জুয়া খেলেন বলেও জানিয়েছেন কয়েকজন রোহিঙ্গা। এ ধরনের এলাকায় মাঝে মাঝে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিপুলসংখ্যক শিশু ও তরুণের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে, কক্সবাজার ও ভাসানচর মিলিয়ে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। তাদের অর্ধেকেরও বেশি শিশু।

কাজ ও বিনোদনের সীমিত সুযোগের কারণে তরুণদের অনলাইন জুয়া ও অপরাধ থেকে দূরে রাখতে বিভিন্ন উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি লার্নিং সেন্টারে লাইব্রেরি ও বিভিন্ন কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব উদ্যোগে তরুণদের ব্যস্ত রাখা গেলে জুয়া ও অপরাধের প্রবণতা কমানো সম্ভব হতে পারে।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘদিনের সহিংসতা, নির্যাতন ও বঞ্চনার প্রভাব তাদের সমাজে রয়েছে। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ক্যাম্পের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।

এসএস