মানবসভ্যতার টিকে থাকা এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতার জন্য পৃথিবীতে যে ‘সেফ অপারেটিং স্পেস’ বা নিরাপদ সীমানা নির্ধারিত ছিল, পৃথিবী তা থেকে আরও আশঙ্কাজনকভাবে দূরে সরে যাচ্ছে। বৈশ্বিক বিজ্ঞানীদের সর্বশেষ এক যৌথ মূল্যায়ন অনুযায়ী, পৃথিবীর পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার ৯টি মৌলিক সীমার মধ্যে ৭টিই ইতোমধ্যে অতিক্রম করে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম 'এনডিটিভি'-এর বরাতে জানা যায়, ২০২৬ সালের ‘প্লানেটারি হেলথ চেক’ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। জার্মানির পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের অধীনে 'প্লানেটারি বাউন্ডারিজ সাইন্স ল্যাব'-এর ৬০ জনেরও বেশি আন্তর্জাতিক জলবায়ুবিজ্ঞানী যৌথভাবে এই নিবিড় গবেষণাটি পরিচালনা করেন। মানবজীবনের বাসযোগ্যতা নিশ্চিত রাখতে ২০০৯ সালে বিজ্ঞানীরা এই ৯টি সীমানা নির্ধারণ করেছিলেন।
যে ৭টি নিরাপদ সীমা ইতোমধ্যে অতিক্রম করেছে
১. জলবায়ু পরিবর্তন (Climate Change)
২. জীবমণ্ডলের অখণ্ডতা (Biosphere Integrity)
৩. ভূমি ব্যবস্থার পরিবর্তন (Land System Change)
৪. মিঠা পানির পরিবর্তন (Freshwater Change)
৫. জৈবরাসায়নিক প্রবাহ (Biogeochemical Flows - নাইট্রোজেন ও ফসফরাস দূষণ)
৬. সিনথেটিক রাসায়নিক ও প্লাস্টিকসহ নতুন দূষণকারী পদার্থ (Novel Entities)
৭. সমুদ্রের অম্লতা বৃদ্ধি (Ocean Acidification) - যা এবারই প্রথম নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রা ছাড়িয়েছে।
যে দুটি সীমা এখনো নিরাপদ পরিসরে রয়েছে:
বিজ্ঞানীরা জানান, স্ট্র্যাটোস্ফেরিক ওজোন স্তরের ক্ষয় (Stratospheric Ozone Depletion) এবং বায়ুমণ্ডলীয় অ্যারোসলের ঘনত্ব (Atmospheric Aerosol Loading) এখনো পুরোপুরি বিপদসীমায় পৌঁছায়নি। বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রভাবে ওজোন স্তরের কিছুটা উন্নতি লক্ষ করা গেছে, যদিও নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে অ্যারোসলের প্রভাব রয়ে গেছে।
কেন এই সতর্কতা ও আমাজন বন নিয়ে চরম উদ্বেগ:
গবেষকদের মতে, কোনো সীমা অতিক্রম করার অর্থ এই নয় যে মুহূর্তের মধ্যে কোনো বিপর্যয় ঘটবে; তবে এটি প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে এমন এক ‘টিপিং পয়েন্টে’ (Tiping Point) নিয়ে যায় যেখানে পরিবেশের পরিবর্তনগুলো দ্রুত এবং চিরতরে অনিয়ন্ত্রণযোগ্য হয়ে ওঠে। বিশেষ করে আমাজন রেইনফরেস্ট, বৈশ্বিক জলাভূমি এবং মহাসাগরগুলোর ওপর মানুষের অতিরিক্ত চাপ ও দূষণ পুরো গ্রহের খাদ্যনিরাপত্তা, পানির বিশুদ্ধতা এবং জলবায়ু কাঠামোর ওপর চরম হুমকি সৃষ্টি করছে।
তবে বিজ্ঞানীরা আশার বাণী শুনিয়ে উল্লেখ করেন, এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত হ্রাস করা, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং অবশিষ্ট প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতে পারলে পৃথিবীকে পুনরায় তুলনামূলক নিরাপদ ও স্থিতিশীল পরিবেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
ডিআর




Comments